Tuesday , 23 December 2025 |
  1. আইন
  2. আদালত
  3. আন্তর্জাতিক
  4. উপসম্পাদকীয়
  5. কৃষি
  6. খুলনা
  7. খেলা
  8. চট্টগ্রাম
  9. চাকরীর খবর
  10. জাতীয়
  11. ঢাকা
  12. তথ্যপ্রযুক্তি
  13. দেশের খবর
  14. নারী
  15. বরিশাল

রাজশাহীতে মানুষের সামনে বিচারহীনতার বলি ভ্যানচালক ফারুক

প্রতিবেদক
sonynews
December 23, 2025 11:16 am

স্টাফ রিপোর্টার: রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় শতাধিক মানুষের সামনে চরম নৃশংস নির্যাতনের শিকার হয়ে কারা হেফাজতে প্রাণ হারিয়েছেন ওমর ফারুক (৩৮) নামের এক ভ্যানচালক। চুরির অপবাদে তাকে প্রকাশ্যে উলঙ্গ করে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করা হয়। লোহার রড দিয়ে পেটানো হয়, হাত-পায়ে পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়, পানি চাইলে নদীতে চুবিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি তার পায়ুপথে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় শুকনো মরিচের গুঁড়া। পরে ‘মাদকের নাটক’ সাজিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

শনিবার (১৮ ডিসেম্বর) ভোরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। নিহত ফারুক ভবানীগঞ্জ পৌরসভার চানপাড়া মহল্লার বাসিন্দা মসলেম সরদারের ছেলে। এ ঘটনায় এলাকায় শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। নিহতের পরিবার দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গত ১৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে ভ্যানচালক ফারুক বাড়ি ফিরছিলেন। সিএনজি স্ট্যান্ডের সামনে ভ্যান রেখে প্রস্রাব করতে গেলে তাকে চুরি করার অপবাদে আটকান ভবানীগঞ্জ সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি রেজাউল করিম ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মতিন।

এরপর তাদের নেতৃত্বে সমিতির সদস্য হান্নান, বিপ্লব, রফিক, মোজাম্মেলসহ ১০-১৫ জন ফারুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। লোহার রড দিয়ে বেধড়ক পেটাতে পেটাতে একপর্যায়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে তাকে একটি প্রাচীরের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে আরও নির্যাতন চালানো হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকজন ফারুককে শক্ত করে ধরে রাখেন। তখন সভাপতি রেজাউল ও সম্পাদক মতিন হাতুড়ি দিয়ে তার দুই হাত ও দুই পায়ে দুই ইঞ্চি লম্বা ৮–১০টি লোহার পেরেক ঠুকে দেন। অসহ্য যন্ত্রণায় ফারুক পানি পানি বলে চিৎকার করতে থাকেন।

এই দৃশ্য দেখে ফারুকের চাচা আনিসুর একটি দোকান থেকে পানির বোতল নিয়ে এগিয়ে গেলে রেজাউল তার হাত থেকে বোতল কেড়ে নেন। কাউকে খবর দিতে না পারে—এজন্য আনিসুরকেও আটকে রাখা হয়।

এরপর নির্যাতনকারীরা ফারুককে উলঙ্গ করে সিএনজি স্ট্যান্ডসংলগ্ন রাণী নদীতে নিয়ে যান। কয়েক দফা পানিতে চুবিয়ে আবার স্ট্যান্ডে এনে নির্যাতন চালানো হয়। পুনরায় পানি চাইলে আবার নদীতে চুবানো হয় তাকে। একপর্যায়ে তার পায়ুপথে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় শুকনো মরিচের গুঁড়া।

ফারুকের অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে পড়লে সমিতির সভাপতি রেজাউল করিম বাগমারা থানায় খবর দেন। পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে এসে তার শারীরিক অবস্থা দেখে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায় বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি।

পরে বাগমারা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ভুঞাকে ফোন করে ঘটনাস্থলে আনা হয়। ফারুকের কাছ থেকে এক পুরিয়া গাঁজা পাওয়া গেছে দাবি করে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাকে সাত দিনের কারাদণ্ড ও ১০০ টাকা জরিমানা করা হয়।

এ বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম ভুঞা বলেন, “তার কাছে গাঁজা পাওয়া গেছে। মারধরের বিষয়টি আমি জানি না। পরে শুনেছি তিনি অসুস্থ, এজন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেছি।”

ভ্রাম্যমাণ আদালতের সাজা দেওয়ার পর ফারুককে পুলিশের গাড়িতে নয়, সমিতির একটি সিএনজিতে পুলিশের পাহারায় প্রথমে বাগমারা উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে তাকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়।

কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার শাহ আলম খান বলেন, “আমরা ফারুককে গুরুতর আহত অবস্থায় গ্রহণ করি। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সার্টিফিকেটেও তা উল্লেখ ছিল। পরদিন সকালে অবস্থার অবনতি হলে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভোর ৫টার দিকে তিনি মারা যান।”

নিহতের বাবা মসলেম সরদার বলেন, “আমরা খবর পেয়ে গিয়ে দেখি সব শেষ। আমার ছেলেকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আমি এর বিচার চাই।”

মা পারুল বেগম পাগলপ্রায় হয়ে বলেন, “আমার ছেলেকে পানিও খেতে দেয়নি। আমরা গরিব মানুষ, কার কাছে বিচার চাইব?”

প্রতিবেশীরা জানান, ফারুকের শরীরের এমন কোনো জায়গা ছিল না যেখানে আঘাতের চিহ্ন নেই।

সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি রেজাউল করিম প্রথমে মারধরের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি তখন রাজশাহীতে ছিলাম।” তবে পরে তিনি বলেন, “খবর পেয়ে গিয়েছি। কে মেরেছে বলতে পারব না।”

বাগমারা থানার ওসি সাইদুল ইসলাম বলেন, “নির্যাতনের বিষয়টি পুলিশ জানত না। গাড়ি সংকটের কারণে সিএনজিতে নেওয়া হয়েছে।”

নির্যাতনকারীদের সামনে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো বৈধ কিনা—এমন প্রশ্নে রাজশাহী বিভাগের কমিশনার ড. আ. ন. ম. বজলুর রশীদ বলেন, “আমি বিষয়টি জানি না। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

সর্বশেষ - আইন