নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী নগরীর টিকাপাড়া গোরস্থানে সাড়ে তিন বছর আগে মারা যাওয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক সহকারী প্রকৌশলী হেফাজ উদ্দিনের নামে কফিন দাফনকে কেন্দ্র করে রহস্যের জট আরও ঘনীভূত হয়েছে। প্রথম দফায় অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে জীবননাশের হুমকি ও অপপ্রচারের পর, এবার মরহুমের পরিবারের দেওয়া লিখিত প্রতিবাদলিপিতেই ফুটে উঠেছে নজিরবিহীন আইনি লঙ্ঘন ও প্রশাসনিক গাফিলতির চিত্র।
গত ৫ সেপ্টেম্বর দৈনিক জাতীয়, অনলাইন ও স্থানীয় দুটি পত্রিকায় অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশের পর পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিবাদলিপিতে দাবি করা হয়—হেফাজ উদ্দিন ২০২৩ সালের মার্চে ঢাকায় মারা যান এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে নিজ বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়। পরবর্তীতে জমি বিক্রি ও পারিবারিক কলহের কারণে গত ২৭ জুলাই ২০২৬ তারিখে পুরনো কবর থেকে হাড়-গোড় ও মাটি সংগ্রহ করে টিকাপাড়া গোরস্থানে পুনঃদাফন করা হয়।
তবে আইনজ্ঞদের মতে, আইনি প্রক্রিয়া ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আগাম অনুমতি ব্যতিরেকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কবর থেকে মরদেহের অবশিষ্টাংশ উত্তোলন ও এক জেলা থেকে অন্য জেলায় পরিবহন স্পষ্টতঃ ফৌজদারি ও প্রশাসনিক বিধিমালার লঙ্ঘন।
প্রতিবাদলিপির ব্যাখ্যার সঙ্গেই বেরিয়ে এসেছে গভীর নথিপত্র জালিয়াতির চিত্র:
রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন (রাসিক) ও ওয়ার্ড কার্যালয়ে জমা দেওয়া নথিতে দেখানো হয়—হেফাজ উদ্দিন ২০২৬ সালের ১০ জুলাই ভারতের কলকাতার মনিপাল হাসপাতালে মারা গেছেন। পরিবারের দাবি, কোনো এক ‘পরিচিত ব্যক্তি’ ভুলবশত এই কাগজপত্র জমা দিয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, ভারতীয় হাসপাতালের মৃত্যুসনদ ও কলকাতা মিউনিসিপাল কর্পোরেশনের ভূয়া কাগজপত্র কীভাবে সরকারি দফতরে পৌঁছাল?
প্রাথমিক সত্যতা যাচাই ছাড়া কীভাবে সিটি কর্পোরেশন ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় মধ্যরাতে দাফন করা কফিনের অনুকূলে নতুন সনদ ইস্যু করল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন নাগরিক সমাজ।
দাফনের রাতে গোরস্থানের নাইটগার্ড ও স্থানীয়দের কাছে দাবি করা হয়েছিল—মরদেহ কলকাতা থেকে এসেছে। যদি কেবল পুরনো হাড় ও মাটি দাফন করাই উদ্দেশ্য হতো, তবে মাঝরাতে পরিবারের শুধুমাত্র একজনের উপস্থিতিতে অ্যাম্বুলেন্সে করে গোয়েন্দা কায়দায় কেন মিথ্যা তথ্য দিয়ে কাজ সম্পন্ন করা হলো?
অনুসন্ধানী সংবাদটি প্রকাশের পর থেকে সাংবাদিক শাহিনুর রহমান সোনাকে মোবাইলে প্রাণনাশের হুমকি ও ‘চাঁদাবাজ’ আখ্যা দিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়। এর প্রতিবাদে রাজশাহী প্রেসক্লাবের উদ্যোগে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে এবং বোয়ালিয়া থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। সচেতন মহলের মতে, সত্য ধামাচাপা দিতেই সাংবাদিকের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে।
একটি পুরনো কবর থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমতি ছাড়া অবশিষ্টাংশ উত্তোলন, অন্য গোরস্থানে দাফন এবং ভারতের হাসপাতালের ভূয়া সনদ ব্যবহারের নেপথ্যে কোনো আন্তর্জাতিক, পারিবারিক বা আইনি জটিলতা ঢাকার চেষ্টা চলছে কি না—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আসল সত্য উন্মোচনের জন্য রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ (আরএমপি) কমিশনার, জেলা প্রশাসক এবং সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয়রা।


















