নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহী মহানগরীর রানীনগর আদর্শ স্কুল সংলগ্ন এলাকায় একটি বিবাদমান জমিতে আদালতের আদেশ অমান্য করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (সিনিয়র সহকারী সচিব) সাদিয়া আফরিনের বিরুদ্ধে। এনিয়ে রাজশাহীর সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ১১জন বাদী হয়ে রাসিক সহ আরও দুই জনকে বিবাদী করে একটি মামলা দায়ের করেছেন। বিজ্ঞ আদালত বিবাদীদের সাত দিনের কারণ দর্শানো নোটিশও প্রদান করেছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ৫০ বছর ধরে রানীনগরে বসবাস করছি। কোন প্রকার সমস্যা হয়নি। কিন্তু যেদিন থেকে রাবির দুই শিক্ষক আমাদের পাশ্ববর্তী জায়গাটি কিনেছেন তারপর থেকে তারা আমাদের হয়রানির ওপর রেখেছেন। তাদের কোনো প্রকার রাস্তা নেই। যেই রাস্তা আছে সেটিও আমার মায়ের (সম্পত্তির মালিক জোসনারা বেগমের সন্তানগণ) কাছে ১৯৯৫ সালে তৎকালীন কাউন্সিলর ভুলভাল বুঝিয়ে লিখে নেন। তবুও আমরা শর্তসাপেক্ষে রাস্তা দিতে রাজি ছিলাম কিন্তু তারা কখনও পুলিশ নিয়ে আবার কখনও ম্যাজিস্ট্রেট দিয়ে আমাদের দখলীয় জমির ওপর জোরপূর্বক রাস্তা নিতে চাইছেন। সম্প্রতি আমরা আদালতে একটি অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে মামলা দায়ের করেছি। এনিয়ে তারা ক্ষিপ্ত। তারা আমাদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে মিথ্যা মামলা দায়ের করে জেলে দেবে বলেও হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। তাছাড়া, কারণ দর্শানো নোটিশ পাবার পরও রাসিক ম্যাজিস্ট্রেট সাদিয়া আফরিন আমাদের জমিতে এসে সেখানে ১০ ফিট রাস্তা দেবার জন্য চাপাচাপি করেছন। এনিয়ে আমরা বেশ হতাশ এবং উদ্বিগ্ন।
সূত্র জানায়, ১৯৭৪ সালে রামচন্দ্রপুর মৌজায় আরএস খতিয়ান নং- ১০৯ ও দাগ নং- ৯৩৯ এর ১২২২ শতক জমি ইসমাইল শেখ দিগর তার সম্পত্তি মোতালেব আলী খানের কাছে বিক্রি করেন। ১৯৮৫ সালে মোতালেব তার স্ত্রী মোসা. জোসনারা বেগমকে উক্ত সম্পত্তি হেবা দলিলের মাধ্যমে রেজিস্ট্রি করে দেন। পরে ১৯৯৫ সালের দিকে একই মৌজার আরএস খতিয়ান নং- ২৩২ এবং দাগ নং- ৯৪০ এর ১৩৬২ শতক জমিটি কিনে সেটিও তার স্ত্রী জোসনারা বেগমের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন। সেক্ষেত্রে জোসনারার মোট জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ২৮২২ শতক। এর মধ্যে ৯৩৯ দাগের কিছু জমি বিক্রি করেন এক ব্যাংক কর্মকর্তার কাছে। বর্তমানে জোসনারার জমির পরিমাণ ১৬ দশমিক ৯৮ শতক। তবে ১৯৯৫ সালে তৎকালীন কাউন্সিলর রাস্তা করে দেবার প্রলোভন দেখিয়ে ৯৪০ নং দাগের উত্তর-দক্ষিণে ৬৪ ফিটের মধ্যে ৬০ ফিট জায়গা (সাড়ে চার ফিট প্রস্থ) করপোরেশনের নামে দান করান। তবে সেটি রাসিকে রাস্তা তৈরি রেকর্ডবুকে আজ পর্যন্ত তালিকাভূক্ত হয়নি। তারপর ৯৪০ দাগের পাশ্ববর্তী জমির মালিক ড. আক্তার বানু ও মিসেস ফজিলাতুন নেসা জোসনারা বেগমের দখলীয় সম্পত্তি থেকে ১০ ফিট জায়গা নিয়ে জোরপূর্বক রাস্তা দাবি করে আসছেন।
জোসনারা বেগম মারা যাওয়ার পর তার সন্তানেরা ওয়ারিশ সূত্রে মালিকানা প্রাপ্ত হন। তবে ৯৩৯ ও ৯৪০ দাগের জমির মাঝখান দিয়ে ১০ ফিট রাস্তা জোরপূর্বক আদায় করার জন্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে মৃত জোসনারার ওয়ারিশদের পেশীশক্তি ও প্রশাসন দিয়ে হয়রানি ও চাপ প্রয়োগ করতে থাকেন। ২১/৪/২৪ ইং তারিখে পুলিশ নিয়ে রাসিকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাদিয়া আফরিনের ঘটনাস্থলে গিয়ে বাদীর দখলীয় প্রাচীর ভেঙ্গে ফেলার নিদের্শ দেন এবং বাদীর দখলীয় সম্পতির ওপর রাসিকের রাস্তা নির্মাণ করার হবে জানান দিয়ে আসেন।
এনিয়ে রাজশাহীর সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে জোসনারা বেগমের ১১জন ওয়ারিশ ১৪৫ ধারায় রাজশাহী সিটি করপোরেশন, ড. আক্তার বানু ও মিসেস ফজিলাতুন নেসার নামে একটি মামলা দায়ের করেন। বিজ্ঞ আদালত মামলাটি গ্রহণপূর্বক ২৪/০৪/২৪ ইং তারিখে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের পক্ষে মেয়র, আক্তার বানু ও ফজিলাতুন নেসাকে সাত দিনের একটি কারণ দর্শানো নোটিশ প্রেরণ করেন। কারণ দর্শানো নোটিশ পেয়ে তার জবাব না দিয়ে উল্টো আদালতের আদেশ অমান্য করে রাসিকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ৩০ এপ্রিল বিবাদমান জমিতে গিয়ে বাদী ও বিবাদী পক্ষের মধ্যে আপোষ করানোর জন্য বসেন।
এ সময় কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী সেখানে ছবি ও ভিডিও ধারণ করলে তিনি এবং তার সঙ্গে থাকা রাসিকের কর্মচারীরা তাতে বাঁধা প্রদান করেন। একপর্যায়ে সাংবাদিকদের নানান প্রশ্নের জালে বিদ্ধ হয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এখানে রাসিকের স্বার্থে এসেছি। করপোরেশনের যে সম্পত্তি তার পরিমাপ করতে এসেছি। কোন বিচার কার্যে নয়’। ছবি এবং ভিডিও ধারণে বাঁধা প্রদান করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কারো ছবি বা ভিডিও নিতে হলে অনুমতি লাগবে। আপনারা অনুমতি না নিয়েই ছবি বা ভিডিও করছেন। এজন্য বাঁধা দেওয়া হয়েছে’। জায়গা জমির বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনি এবং বাদীপক্ষ নেই কেনো? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাদী পক্ষকে জানানো হয়েছে এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিকেও এই বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে কিন্তু কেউ না আসলে তাদের হাতে-পায়ে ধরে এনে বসানো সম্ভব না। তাই উপস্থিত যারা আছেন তাদের নিয়েই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে’। তবে আদালতের কারণ দর্শানো নোটিশ এবং আদালতের অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
বিবাদী রাবি শিক্ষক আক্তার বানুর ভাষ্য, বহুবার এই বিষয়ে আমরা স্থানীয়ভাবে বসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছি তাই আমরা সিটি করপোরেশনকে জানায়। আমাদের আর্জির প্রেক্ষিতেই করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সরেজমিন পরিদর্শন করেন এবং সার্ভেয়ার দিয়ে পরিমাপ করান। তবে ওই সময়েও তারা (বিরোধীপক্ষ) উপস্থিত ছিল না। তাই বিষয়টি অমীমাংসিতই রয়েছে। আর ব্যাপারটি যেহেতু আদালতে গেছে, সেহেতু আদালত যে রায় দিবেন সেটি আমি মেনে নেবো। তবে আরেক বিবাদী মিসেস ফজিলাতুন নেসাকে তার মুঠোফোনে একাধিকবার কল করেও পাওয়া যায়নি।
বাদীপক্ষের আইনজীবী আজিমুশ সান উজ্জল বলেন, ‘প্রথম কথা হচ্ছে আমার মক্কেলের মাকে (জোসনারা) তৎকালীন কাউন্সিলর ভুল বুঝিয়ে রাস্তা লিখে নিয়েছিলেন। এখন ওই রাস্তাটি আমরা ফেরত নেবার জন্য আবেদন করেছি। কারণ আমার মক্কেল যে রাস্তাটি দিয়েছে তা ৬০ ফিট দৈর্ঘ্যের এবং সাড়ে চার ফিট প্রস্থের। আর তাদের মাটিই আছে ৬৪ ফিটের। বাকি চার ফিট তাহলে কাদের জন্য? এই রাস্তাটি মূলত নিজেদের ব্যবহারের জন্যই ছাড়া হয়েছিল। আবার পূর্ব-পশ্চিমের ১০৮ ফিটে দৈর্ঘ্যে ও ১০ ফিট প্রস্থের রাস্তা সেটিও আমার মক্কেলের ছাড়া। তাহলে তার জমি সবদিক থেকেই কমে যায় এবং তার ওয়ারিশগণ চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাছাড়া ৬০ ফিট ছাড়া রাস্তাটি রাসিকের রেকর্ডবুকেও নেই এবং এটি কারো কাজেও আসছে না। তাই ওই প্রদেয় রাস্তাটি তারা ফেরত চান।
তিনি আরও বলেন, যেখানে বিজ্ঞ আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে একটি মোকাদ্দমা হয়েছে; সেখানে রাসিক ম্যাজিস্ট্রেটের এমন পদক্ষেপ কাম্য নয়। কারণ দর্শানো নোটিশ সময় মতো না দিয়েই তিনি বিবাদমান ঘটনাস্থলে গিয়ে আদালতের আদেশ অমান্য করেছেন। আমরা এবিষয়ে উচ্চ আদালতের এপিলিড ডিভিশনে আপিল করবো এবং বিষয়টির ব্যাখ্যা চাইবো বলেও জানান তিনি।
এ ব্যাপারে ২৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বিষয়টি জানার পর দুই পক্ষকেই আমি ডেকেছিলাম। কিন্তু রাবির শিক্ষক আক্তার বানু এবং মিসেস ফজিলাতুন নেসা পরে আর যোগাযোগ করেননি। তারপরও ৩০ তারিখে রাসিক ম্যাজিস্ট্রেট আমাকে সকাল ১১ টার দিকে ঘটনাস্থলে এসে বসার কথা বললে আমি সঠিক সময়ে যায়। কিন্তু ঘন্টার পর ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও তারা না আসা আমি সেখান থেকে চলে আসি। পরে কি হয়েছে তা আমার জানা নেই। তবে যেখানে বিজ্ঞ আদালত যেখানে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার জন্য বলেছেন সেখানে মাথা ঘামানো ঠিক হবে না বলেই আমি মনে করি’।