অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে ধারাবাহিক সংবাদ ও আন্দোলন। তদন্ত কমিটিও গঠন হয়েছিল
রাজশাহী প্রতিনিধি:
অবশেষে পদত্যাগ করেছেন রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) ডা. মো. জাওয়াদুল হক। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে তিনি পদত্যাগপত্রে সই করেন বলে জানা গেছে। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার নাজমুল হকও পদত্যাগ করেছেন।
ভিসির দায়িত্ব পালনকালে ডা. জাওয়াদুল হকের বিরুদ্ধে নিয়োগ, টেন্ডার, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। অভিযোগগুলোর তদন্তের জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকেও কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
অন্যদিকে ভিসির অপসারণের দাবিতে ‘রাজশাহী ছাত্রজনতা’ ব্যানারে আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদান এবং একাধিকবার মানববন্ধনসহ অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়। সর্বশেষ ভিসির পদত্যাগের দাবিতে ‘ভিসি ঘেরাও’ কর্মসূচিরও ঘোষণা দেওয়া হয়।
নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভিসির দায়িত্ব নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিশেষ করে সেকশন অফিসার নাজমুল হককে পিএসসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি তারা সামনে আনেন।
তাদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, ইউজিসির নীতিমালা ও সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ না করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অবসরপ্রাপ্ত কয়েকজন কর্মকর্তাকে বারবার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়ারও অভিযোগ করেন তারা।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে নিয়োগের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছিলেন আন্দোলনকারীরা।
গাছ, ভবন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনাধীন প্রকল্প এলাকায় থাকা গাছ, পুরোনো ভবন ও সীমানাপ্রাচীরসহ সরকারি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগও তোলা হয়।
আন্দোলনকারীদের দাবি, প্রকল্প এলাকার বিপুলসংখ্যক গাছ এবং পুরোনো ভবনসহ সরকারি সম্পদ টেন্ডার বা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অপসারণ কিংবা বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। গত বছর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার আম বিক্রির ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ তোলা হয়।
এছাড়া পুকুর ও ফসলি জমি লিজ এবং দোকান ভাড়াসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সম্পদ ব্যবস্থাপনায় আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও তারা করেছেন। এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করা হয়েছে।
৭৭৭ কোটি টাকার প্রকল্পের টেন্ডার নিয়েও বিতর্ক
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৭৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচটি ভবন নির্মাণের টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটিতে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন দাবির অভিযোগও তারা তুলে ধরেন।
এমন অভিযোগের পর ভিসিকে নিয়ে ‘মিস্টার নাইন পারসেন্ট’ নামে একটি বিতর্ক তৈরি হয় বলে আন্দোলনকারীরা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল ছাড়া অভিযোগগুলোকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কেনাকাটার টেন্ডারেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে বলে দাবি আন্দোলনকারীদের। বিশেষ করে লিথো ও ওএমআর পেপার সরবরাহের কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
নির্মাণকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন
বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন প্রকল্পের সীমানাপ্রাচীর, গেট নির্মাণ এবং বালু-মাটি ভরাটের কাজ নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলনকারীরা দাবি করেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) পর্যবেক্ষণে এসব কাজে কারিগরি ত্রুটি ও মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতির বিষয় উঠে এসেছে।
তাদের দাবি, প্রকল্পের প্রতিটি কাজের ব্যয়, মান এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সম্পদের তথ্য তদন্তের দাবি
এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে ভিসি ডা. জাওয়াদুল হক ও তাঁর পরিবারের নামে রাজশাহী ও ঢাকায় একাধিক সম্পদের তথ্য থাকার দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা।
তাদের অভিযোগের মধ্যে রাজশাহীর উপশহর, চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকায় জমি ও ভবন এবং ঢাকার মিরপুর এলাকায় ফ্ল্যাট থাকার তথ্য রয়েছে। এসব সম্পদের উৎস ও বৈধতা যাচাইয়ের জন্য নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে কারও সম্পদকে অবৈধ বা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং আইনানুগ তদন্ত প্রয়োজন।
তদন্তের ফল কী?
ভিসির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের পর স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এখন তাঁর পদত্যাগের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—তদন্তে কী পাওয়া গেছে এবং অভিযোগগুলোর বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে।
আন্দোলনকারীদের দাবি, ভিসির পদত্যাগের মধ্য দিয়ে বিষয়টির শেষ নয়। তাঁর দায়িত্বকালীন নিয়োগ, টেন্ডার, কেনাকাটা, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ ব্যবস্থাপনার অভিযোগগুলো নথিপত্রের ভিত্তিতে তদন্ত করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম যাতে ব্যাহত না হয়, সে জন্য দ্রুত নতুন ভিসি নিয়োগ এবং একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (রামেবি) ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) ডা. জাওয়াদুল হকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে পদত্যাগের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেকশন অফিসার নাজমুল হক বলেন, ‘আমি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করিনি। আমাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারব না।’

















