ইফতেখার আলম বিশাল: রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)-এ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের নিজস্ব ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন নীতিমালা-২০২৩’ উপেক্ষা করে প্রভাবশালী কয়েকজন কর্মকর্তাকে একই স্টেশনে বছরের পর বছর রেখে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পদায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সাম্প্রতিক বদলি ও পদায়ন আদেশে প্রায় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হলেও, দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ প্রভাব বিস্তারকারী একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মূল সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের সাংগঠনিক প্রভাব ভাঙা সম্ভব হয়নি। বরং কৌশলে তাদের অনেককেই আবার প্রধান কার্যালয় ও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে একত্রিত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ব্যাংকের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে আগের আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।
একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে, বিএনপি-সমর্থক হিসেবে পরিচিত বা বর্তমান প্রশাসনের অনুগত নন—এমন অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দূরবর্তী ও কম গুরুত্বপূর্ণ শাখায় বদলি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এ ধরনের পদায়ন প্রশাসনিক প্রয়োজনের চেয়ে মতাদর্শগত বিবেচনা ও প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যেই করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ অনুমোদিত বদলি নীতিমালা এবং ১০৭ কর্মকর্তার বদলি সংক্রান্ত অভিযোগের একটি নথি গণমাধ্যমের হাতে এসেছে। নথিতে বলা হয়েছে, নীতিমালার স্পষ্ট নির্দেশনা অমান্য করে একই স্টেশনে পুনঃপদায়ন, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে বহাল রাখা এবং বাছাই করে বদলির মাধ্যমে প্রশাসনে বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে।
ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মোঃ গোলাম মুরতুজা বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের পর বদলি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার পরিবর্তে ব্যক্তিপছন্দ ও প্রভাবের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
২০২৩ সালের বদলি নীতিমালায় বলা হয়েছে—একই কর্মস্থলে টানা তিন বছরের বেশি রাখা যাবে না।
প্রধান কার্যালয়, বিভাগীয় কার্যালয়, জোনাল কার্যালয় এবং একই শহরের শাখাগুলোকে একই স্টেশন হিসেবে গণ্য করতে হবে। একই স্টেশনে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে পদায়ন করা যাবে না।
প্রশাসনিক প্রয়োজন ব্যতীত কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া যাবে না। কিন্তু অভিযোগে বলা হয়েছে, বাস্তবে এসব বিধানের একাধিকটি মানা হয়নি।
অভিযোগপত্রে ১২ জন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে—কেউ প্রায় ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে একই স্টেশনের আওতায় চাকরি করছেন।
কাউকে প্রধান কার্যালয় থেকে আবার প্রধান কার্যালয়ের অন্য বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে, যা নীতিমালা অনুযায়ী একই স্টেশনে বদলি হিসেবে গণ্য হয় না।
কয়েকজনকে তিন বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই আবার একই স্টেশনের অন্য দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন জেলা ও প্রত্যন্ত এলাকায় কর্মরত থাকলেও তাদের বদলির আবেদন উপেক্ষিত হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, একই ধরনের অবস্থানে থাকা অনেক কর্মকর্তাকে বদলি করা হলেও প্রভাবশালী কয়েকজনকে একই স্থানে রেখে শুধু বিভাগের নাম পরিবর্তন করে পদায়ন দেখানো হয়েছে।
অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, কিছু কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার ভিত্তিতে সুবিধাজনক পদায়ন দেওয়া হয়েছে। তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো সরকারি তদন্তের ফলাফল এখনো প্রকাশ হয়নি।
রাকাবের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিরুদ্ধে এর আগেও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পদায়ন, নিয়োগ এবং দাপ্তরিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠেছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায় স্বীকার করা হয়নি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন এই বদলি বিতর্ক সেই পুরোনো অভিযোগগুলোকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।
ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, একই প্রতিষ্ঠানে দুই ধরনের নীতি চলছে। কেউ বছরের পর বছর প্রধান কার্যালয়ে থেকে সুবিধা ভোগ করছেন, আবার অনেককে নিয়মিত দূরবর্তী এলাকায় বদলি করা হচ্ছে। এতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে এবং প্রশাসনের প্রতি আস্থাও কমছে।
অভিযোগকারীরা বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং রাকাব পরিচালনা পর্ষদের কাছে পুরো বদলি প্রক্রিয়া তদন্ত করে নীতিমালা লঙ্ঘনের দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের (রাকাব) ডিএমডি ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম মোর্তুজার বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি প্রশ্ন পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। “তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরের প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হবে।”
এ বিষয়ে রাকাবের পরিচালনা পর্ষদের পরিচালক ও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার মো. এএনএম বজরুল রশীদ বলেন, চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বের মধ্যেই রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া। তবে বদলি নীতিমালা লঙ্ঘন বা অনিয়মের মতো কোনো অভিযোগ থাকলে তা চেয়ারম্যান বরাবর লিখিতভাবে জানানো যেতে পারে। চেয়ারম্যান অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করলে তা পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করতে পারেন। তখন পর্ষদে বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, অভিযোগ থাকলেও তা সরাসরি পরিচালনা পর্ষদের নজরে আসার সুযোগ সীমিত। ফলে বদলি ও পদায়নে নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ উত্থাপন এবং তা পর্ষদে উপস্থাপনের ওপরই পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকটা নির্ভর করছে।
(ধারাবাহিক পর্বের প্রথম পর্ব)


















