স্টাফ রিপোর্টার : রাজশাহীর জিরোপয়েনেট অবস্থিত হোটেল ওয়ারিসান সেমিনার হলে উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্টান বারসিক’র এর আয়োজনে সবার জন্য নিরাপদ আবাসন,অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল রাজশাহী গঠনে নগর নীতি সংলাপ অনুষ্টি হয়। সংলাপে রাজশাহী মহানগরের বস্তিবাসী, নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী এবং প্রান্তিক মানুষের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, জলবায়ু-সহনশীল ও পরিবেশবান্ধব নগর গঠনের লক্ষ্যে একটি নীতিগত পলিসি ব্রিফ তুলে ধরেন বারসিক’র গবেষক ও আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. শহিদুল ইসলাম।
পলিসি ব্রিফে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রায় ৮ লক্ষাধিক মানুষের এই মহানগরে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এখনো অনিরাপদ ও অনানুষ্ঠানিক ঝুঁকিপূর্ণ বসতিতে বসবাস করছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সেনসাস (২০১৪) অনুযায়ী রাজশাহী মহানগরে অন্তত ১০৪টি বস্তিতে প্রায় ৩৯ হাজারের বেশি মানুষের বসবাস রয়েছে। এক দশকেরও বেশি সময় অতিক্রান্ত হওয়ায় বর্তমানে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অথচ নগর উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের বিষয়টি এখনো প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি।
পলিসি ব্রিফে বলা হয়েছে, রাজশাহীর বস্তিবাসীরা নিরাপদ আবাসন, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা, উন্মুক্ত খেলার মাঠ ও সবুজ পরিবেশসহ মৌলিক নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা, জলাবদ্ধতা ও পানির সংকট তাদের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ফলে আবাসনের বিষয়টি কেবল উন্নয়নের নয়, বরং মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও জলবায়ু ন্যায্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।
এতে আরও বলা হয়েছে, দেশের অন্যান্য বড় শহরে বস্তি উন্নয়ন ও সামাজিক আবাসন নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও রাজশাহীতে এখনো দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কোনো সামাজিক আবাসন কর্মসূচি গড়ে ওঠেনি। তাই রাজশাহীর জন্য একটি স্বতন্ত্র, অংশগ্রহণমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল নগর আবাসন নীতি প্রণয়ন জরুরি।
পলিসি ব্রিফে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন, রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, গবেষক, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের প্রতি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সামাজিক আবাসন, জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ, নগরের পুকুর ও সবুজ এলাকা রক্ষা, নারী ও যুবদের সবুজ জীবিকার সুযোগ সৃষ্টি এবং মানুষসহ সকল প্রাণবৈচিত্র্যে জন্য নিরাপদ নগর পরিবেশ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
উক্ত সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন। তিনি বলেন- রাজশাহীতে খুব শীঘ্রই বস্তিবাসীর আবাসন সংকট দুর হবে, এর জন্য মাননীয় ভূমিমন্ত্রী, আরডিএ, নাগরিক পক্ষসহ সকলের সমন্বয়ে একটি পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। তিনি আরো বলেন- রাজশাহী শহরে আর কোন পুকুর দখল বা ভরাট হবেনা, আমরা ফান্ড করেছি , দরকার হলে বেসরকারি পুকুরগুলো কিনে নিয়ে সংরক্ষণ করা হবে সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে।
সংলাপে উপস্থিত থেকে আলোচনায় অংশ নিয়েছেন- গ্রিন কোয়ালিশন রাজশাহীর সভাপতি মাহবুব সিদ্দীকী, রাজশাহী নগর দরিদ্র অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব নিলুফার ইসমত আরা, সেভ দ্যা নেচারের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান, বরেন্দ্র ইয়ুথ ফোরামের সভাপতি আতিকুর রহমান, রাজশাহীর বিভিন্ন বস্তি থেকে আগত প্রতিনিধিগণ।
“বুধপাড়া বস্তির জাহেদা বেগম বলেন- আমাদের একদিকে অনেক কষ্ট করে থাকি, অন্যদিকে সবসময় উচ্ছেদের ভয়ে থাকতে হয়।” তিনি বস্তিবাসীর আবাসন নিশ্চিত করার দাবি করেন।
হরিজন পল্লীর জয়দেব কুমার বলেন- আমাদের পাড়ার ভেতরের পুকুর লিজ দেয়, এর ফলে জল পাইনা, কিন্ত একসময় আমরা এটা ব্যবহার করতাম, আমাদের বাড়িঘর ভাঙ্গা। তিনি দাবি করেন- আমাদের থাকার জন্য নিরাপদ আশ্রয় দরকার আর পুকুর লিজ বন্ধ করতে হবে।
গ্রিন কোয়ালিনের সভাপতি মাহবুব সিদ্দিকী বলেন- বস্তিবাসীদের আবাসন নিশ্চি না করে আর কোন বস্তি উচ্ছেদ নয়, তিনি ঢাকার মতো বস্তিবাসীদের জন্য দ্রæত আবাসন তৈরীর দাবি জানান।
সংলাপের শেষে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটনের হাতে সবার জন্য নিরাপদ আবাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল রাজশাহী গঠনের আহ্বান হিসেবে সাত দফা বিশিষ্ট একটি কৌশলগত দিকনির্দেশনা পত্র তুলে দেয়া হয়।
কৌশলগত দিকনির্দেশনার মধ্যে আছে-
১. রাজশাহীতে একটি সরকারি ও কমিউনিটি-ভিত্তিক সামাজিক আবাসন কর্মসূচি চালু করা জরুরি, যা ঢাকার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য আবাসন ব্যবস্থার উদ্যোগ নিতে হবে।
২. নতুন আবাসন কাঠামো অবশ্যই জলবায়ু-সহনশীল হতে হবে, যেখানে তাপ নিয়ন্ত্রণ, বায়ু চলাচল এবং বৃষ্টির পানি ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৩. নগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে নগর জীবনের মানবিক দিক পুনরুদ্ধার হয়।
৪. নগরের পুকুর, খাল ও সবুজ স্থান সংরক্ষণকে নগর উন্নয়নের মূল অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এবং বিদ্যুৎ ও পানির সুব্যবস্থা করতে হবে।
৫. নারী ও যুবদের জন্য সবুজ জীবিকা এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যা আবাসন নিরাপত্তার সঙ্গে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকেও যুক্ত করবে।
৬. বস্তিবাসীদের কেবল সুবিধাভোগী নয়, বরং নগর পরিকল্পনার অংশীদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৭. শুধু মানুষ নয় নগরের অন্যান্য প্রাণের খাদ্য ও বাসস্থানকে নিরাপদ করার পরিকল্পনাতেও গুরুত্ব দিতে হবে।

















