আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এবং এসআইআর বাতিল চেয়ে রবিবার ফের পথে নেমেছিল ‘ইন্ডিয়া’। রামলীলা ময়দানে তাদের ডাকে রবিবার ভোর থেকে জমায়েত শুরু হয়। বিকেল ৩টের কিছু আগে হুডখোলা গাড়িতে চেপে রামলীলা ময়দানে পৌঁছোন রাহুল গাঁধী, সমাজবাদী পার্টি (এসপি)-র অখিলেশ যাদব, সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি প্রমুখ। একে একে বক্তৃতা করেন আইসা নেত্রী নেহা বোরা, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খড়্গে, ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি)-এর নেতা ফারুক আবদুল্লা। শেষ বক্তা ছিলেন রাহুল। প্রত্যেকেই তাঁদের বক্তৃতায় বিজেপি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘ভোটচুরির’ অভিযোগ তোলেন।
বক্তৃতায় জ্ঞানেশের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেও নিশানা করেন রাহুল। চিরায়ত ভঙ্গিতে জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ বলে কটাক্ষ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূল হারেনি। জোর করে হারানো হয়েছে। নিজের বক্তৃতায় পশ্চিমবঙ্গে ভোট লুটের অভিযোগ করেন এসপি প্রধান অখিলেশও। জ্ঞানেশ পদত্যাগ না-করা পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ডাক দেন খড়্গে। ‘মোদী হটাও, গণতন্ত্র বাঁচাও’ স্লোগান তোলেন তিনি।
সংবিধানকে ধ্বংস হতে দেব না’
রামলীলা ময়দানের সভার শেষ বক্তা হিসেবে বক্তৃতা করতে উঠে জ্ঞানেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেন রাহুল। লোকসভার বিরোধী দলনেতা বলেন, “আমার কথা শুনে রাখুন। আমি যা বলি, পরে তা সত্যিই হয়। নয় কি? আমি দেশের প্রতিটি মানুষকে, প্রত্যেক যুবককে বলছি, জ্ঞানেশ কুমারকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে সরানো হবে। জ্ঞানেশ কুমার জেলে যাবেন।” একই সঙ্গে রাহুলের সংযোজন, “জ্ঞানেশ কুমারকে ছাড়া নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। অমিত শাহও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারবেন না।” প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিশানা করে রাহুলের সংযোজন, “অমিত শাহজি বলেছিলেন, নরেন্দ্র মোদী কোথাও যাবেন না। আমি আপনাদের উল্টোটা বলছি। নরেন্দ্র মোদী কোথাও যেতে পারবেন না। যদি তিনি যেতেও চান, আমরা তাঁকে যেতে দেব না। জ্ঞানেশ কুমারের পর তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করা হবে।” মোদী-শাহ এবং জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার হুঁশিয়ারি দিয়ে রাহুল বলেন, “আমরা হিংসায় জড়াব না, কারও ক্ষতি করব না, ঘৃণাও ছড়াব না। কিন্তু দেশের সংবিধানকেও ধ্বংস হতে দেব না।”
এসআইআর-এর শিকার বাংলা’
পশ্চিমবঙ্গ কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়ার শিকার বলে দাবি করেন মমতা। ভোট লুটের অভিযোগ তুলে বিজেপিকেও নিশানা করেন তিনি। বলেন, “এরা ভোটচুরি করে দেশের গণতন্ত্র এবং সংবিধানকে লুট করেছে। বিজেপি যুব সম্প্রদায়ের চাকরি চুরি করেছে, মেয়েদের সম্মান চুরি করেছে। মন্দিরে জমা পড়া দানের টাকাও চুরি করেছে। এদের আমরা ক্ষমতা থেকে সরাবই।” মমতার দাবি, বিজেপির নিজস্ব কোনও সংগঠন নেই। তাই বিজেপির বিরুদ্ধে পুলিশকে দিয়ে দলের কাজ করানোর অভিযোগ তুলেছেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। একই সঙ্গে মমতা বলেন, “আমরা জীবন দিয়ে দেব, তবু লড়াই চালিয়ে যাব। আত্মসমর্পণ করব না। ওরা আমাদের বাংলাকে লুট করেছে। আমরা গণতন্ত্রকে রক্ষা করব।”
২০২৭ সালে উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি হেরে যাবে বলে দাবি করলেন অখিলেশ যাদব। ২০২৪ সালের লোকসভায় উত্তরপ্রদেশের বিজেপির খারাপ ফলের দিকে ইঙ্গিত করে এসপি প্রধান বলেন, “ওটা বিদায়ের সূচনা ছিল। ২০২৭ সালের ভোটে এমন বিদায় দেওয়া হবে যে, ওরা (বিজেপি) আর ফিরতে পারবে না। উত্তরপ্রদেশের মানুষ খুব ভাল ভাবে স্বাগত জানাতে পারে। আরও ভাল ভাবে বিদায় জানাতে পারে।”
‘জ্ঞানেশকে বাঁচাচ্ছেন মোদী-শাহ
জ্ঞানেশ কুমারকে নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ রক্ষা করছেন বলে অভিযোগ করলেন কংগ্রেস সভাপতি তথা রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা খড়্গে। তিনি বলেন, “মোদী এবং শাহ জ্ঞানেশ কুমারকে দিয়ে দলিত, যুব সম্প্রদায় এবং মহিলাদের ভোট ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। যত ক্ষণ না জ্ঞানেশ যাচ্ছেন, আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।”
‘এসআইআর সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’
সিপিআইএমএল (লিবারেশন)-এর সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন, “গোটা দেশ বুঝতে পারছে যে, মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার যন্ত্র হল এসআইআর। এটা মানুষের উপর সরকারের সার্জিক্যাল স্ট্রাইক।” বক্তৃতা করতে উঠে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক এমএ বেবি বলেন, “এটা ভারতের দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম।”
সমর্থন করেও মঞ্চে থাকল না সিজেপি
বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’-র জ্ঞানেশ-বিরোধী বিক্ষোভ কর্মসূচিকে সমর্থন জানালেও রামলীলা ময়দানের সভায় থাকল না ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। শনিবারই দিল্লিতে তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করার পর সিজেপি প্রধান অভিজীৎ দিপকে বলেছিলেন, “আমরা এই বিক্ষোভকে সমর্থন করছি। কিন্তু সিজেপি একটি স্বাধীন সংগঠন। এটা নিরপেক্ষ মঞ্চ। আমরা সেটা বজায় রাখতে চাই।” একই সঙ্গে দিপকে জানান, ‘ভোটচুরির’ বিরুদ্ধে যে সংগঠনই লড়াই করবে, সিজেপি তাদের সমর্থন করবে। দিপকের ঘোষণা মোতাবেক রবিবার রামলীলা ময়দানে সিজেপি শীর্ষনেতৃত্বের কাউকে দেখা যায়নি। তবে ‘ইন্ডিয়া’-র শরিক দলগুলি ছাড়াও ছিলেন বিভিন্ন ছাত্র-যুব সংগঠন, নাগরিক মঞ্চের প্রতিনিধিরা। অন্য দিকে, ‘ইন্ডিয়া’-র শরিক না-হলেও বিরোধী জোটের বিক্ষোভ কর্মসূচিকে সমর্থন জানিয়েছে সিকিমের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী পবম চামলিঙের দল সিকিম ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এসডিএফ)।


















