রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণের কাজ করতে গিয়ে মাটির নিচে থাকা ডিজেল সরবরাহের পাইপ ফেটে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ড্রেনে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ে। ঘটনার প্রকৃত কারণ, নষ্ট হওয়া ডিজেলের পরিমাণ এবং সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করবে কমিটি।
রবিবার (২৩ আগস্ট) বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম), পাকশীর অধীনে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে বলে জানিয়েছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) ফরিদ আহমেদ।
এর আগে শনিবার (২২ আগস্ট) রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের ৮ নম্বর প্ল্যাটফর্মসংলগ্ন এলাকায় প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণের কাজ চলাকালে এসকেভেটরের আঘাতে মাটির নিচে থাকা ডিজেল সরবরাহের পাইপ ফেটে যায়। এরপর পাইপ দিয়ে ডিজেল বের হয়ে পাশের ড্রেনে ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে অনেকে বালতি, ড্রাম ও বিভিন্ন পাত্র নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ডিজেল সংগ্রহ করেন। রেলওয়ের পক্ষ থেকে পরে চেক ভালভ বন্ধ করে ডিজেলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, প্রায় ১০ হাজার লিটার ডিজেল ড্রেনে চলে গেছে। তবে রেলওয়ে এখনো এ পরিমাণ নিশ্চিত করেনি।
তবে ঘটনার এক দিন পরও রাজশাহী রেলগেট এলাকায় ড্রামে করে ওই ডিজেল বিক্রি করতে দেখা গেছে। ডিজেল বিক্রেতা সাজ্জাদ বলেন, “আমরা ড্রেন থেকে পঞ্চ দিয়ে চুষে জারকিনে জমিয়ে রেলগেটে ৫০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করেছি।” তাঁর দাবি, এলাকার আরও অনেকে ড্রেন থেকে ডিজেল সংগ্রহ করে বিক্রি করেছেন। সব মিলিয়ে আনুমানিক দুই থেকে আড়াই লাখ টাকার ডিজেল বিক্রি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। বর্তমান বাজারে ডিজেলের দাম ১১৭ টাকা লিটার হলেও ৫০ টাকা দরে বিক্রির কারণ জানতে চাইলে সাজ্জাদ বলেন, “ড্রেনের পানি ও ময়লা মিশে যাওয়ায় কম দামে দিয়ে দিচ্ছি।” তবে তার এ দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জিএম ফরিদ আহমেদ বলেন, “তদন্ত কমিটি নিরূপণ করবে আসলে কত লিটার তেল নষ্ট হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে ঠিকাদারের কাছ থেকে সেই ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে।”
তিনি জানান, তদন্তে ঘটনার সময় ট্যাংকে কত লিটার ডিজেল ছিল, তার আগের ও পরের স্টকের হিসাব এবং পাইপ ফেটে বেরিয়ে যাওয়া জ্বালানির পরিমাণ মিলিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে কতটুকু ডিজেল উদ্ধার করা হয়েছে এবং কতটুকু ড্রেন দিয়ে চলে গেছে, সেটিও নির্ধারণ করা হবে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, স্টেশনের তেলের ডিপোতে ট্রেনের ইঞ্জিন ও পাওয়ার কারের জন্য সরকারি বরাদ্দের ডিজেল সংরক্ষণ করা হয়। সংশ্লিষ্ট একটি ট্যাংকের ধারণক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার লিটার। তবে ঘটনার সময় ওই ট্যাংকে প্রকৃতপক্ষে কত লিটার ডিজেল ছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়। ফলে স্থানীয়দের দাবি করা ১০ হাজার লিটার ডিজেল নষ্ট হওয়ার বিষয়টিও তদন্তে যাচাই করা হবে।
এদিকে, শুধু ডিজেল নষ্ট হওয়ার পরিমাণ নয়, মাটি কাটার আগে মাটির নিচে থাকা পাইপলাইন চিহ্নিত করা হয়েছিল কি না, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পাইপলাইনের অবস্থান বা নকশা সম্পর্কে জানানো হয়েছিল কি না এবং কাজ শুরুর আগে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছিলেন কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
রেলওয়ের এসএই এআইডব্লিউ মো. ইমরান হোসেন জানান, ৮ নম্বর লাইনে নতুন করে মাটি কাটার সময় পাইপটি কেটে যায়। ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘রুবেল এন্টারপ্রাইজ’ সেখানে কাজ করছে। পুরোনো লাইনের জায়গায় নতুন করে কাজ করতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানান তিনি।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেই এখন স্পষ্ট হবে—ঘটনায় প্রকৃতপক্ষে কত লিটার সরকারি ডিজেল নষ্ট হয়েছে, কতটুকু উদ্ধার করা গেছে, সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত এবং এ ক্ষতির দায় শেষ পর্যন্ত কার ওপর বর্তায়।


















