১০ তলায় আবাসিক ব্যবহার, রাতে অফিস; ভ্রমণ ব্যয় ও ‘পছন্দের’ কর্মকর্তাদের সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন
ইফতেখার আলম বিশাল: রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে (রাকাব) কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা চলার মধ্যেই ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) গোলাম মুর্তজার বিরুদ্ধে আরও কিছু প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ১০ম তলায় দুটি কক্ষ আবাসিকভাবে ব্যবহার, নিয়মিত কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, বিমানযোগে ঢাকা-রাজশাহী যাতায়াত এবং অফিস সময়ের বাইরে রাতে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগগুলোর পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়নে পক্ষপাত এবং নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত এমডি গোলাম মুর্তজার বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
গত ৮ আগস্ট রাকাবের বদলি ও পদায়ন নীতিমালা লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পরদিন ৯ আগস্ট রাতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গোলাম মুর্তজাকে অফিস করতে দেখা গেছে বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন।
অফিস সময়ের বাইরে একজন ভারপ্রাপ্ত এমডির এভাবে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো লিখিত অনুমোদন বা নির্দিষ্ট প্রশাসনিক বিধান রয়েছে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
ওই রাতে বিষয়টি জানতে প্রতিবেদক রাকাবের প্রধান কার্যালয়ে গেলে নিরাপত্তাকর্মীরা ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দেননি। পরে গোলাম মুর্তজার সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
ব্যাংকের একাধিক সূত্রের দাবি, রাকাবের প্রধান কার্যালয়ের ১০ম তলায় গোলাম মুর্তজা এবং জিএম তাজউদ্দীন আহমেদের জন্য ব্যবহৃত দুটি কক্ষ আবাসিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সেখানে রাতযাপন করা হয়ে থাকে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের দাপ্তরিক কক্ষ আবাসিক কাজে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো অনুমোদন রয়েছে কি না, থাকলে কোন বিধানের আওতায় এবং কার অনুমোদনে এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তরও চান কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে ব্যাংকের প্রশাসন শাখার নথি, ভবন ব্যবহারের অনুমোদন এবং সংশ্লিষ্ট কোনো অফিস আদেশ থাকলে তা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন কয়েকজন কর্মকর্তা।
অভিযোগ রয়েছে, ডিএমডি গোলাম মুর্তজা নিয়মিত কর্মস্থলে অবস্থান না করে ঢাকা ও রাজশাহীর মধ্যে বিমানযোগে যাতায়াত করেন। এ কারণে তার বিমানভাড়া, আবাসন ও অন্যান্য ভ্রমণ ব্যয় কীভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
যদি এসব ব্যয় ব্যাংকের তহবিল থেকে হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ভ্রমণ বিল, ভাউচার, অনুমোদন এবং দাপ্তরিক সফরের উদ্দেশ্য যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন কর্মকর্তারা।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ব্যাংকের হিসাব ও প্রশাসনিক নথি পর্যালোচনা ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এর আগে রাকাবের ‘কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন নীতিমালা-২০২৩’ অনুসরণ না করার অভিযোগ ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বিভিন্ন স্থানে বদলি করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে একই স্টেশনে থাকা কিংবা প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তার ক্ষেত্রে ভিন্ন নীতি প্রয়োগ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কিছু কর্মকর্তাকে একই স্টেশনে দীর্ঘ সময় রাখার পাশাপাশি ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একই এলাকার বিভিন্ন পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কয়েকজনকে সরিয়ে দূরবর্তী বা তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ শাখায় পাঠানো হয়েছে।
তবে এসব বদলি প্রশাসনিক প্রয়োজন, দক্ষতা, পদোন্নতি কিংবা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে হয়েছে কি না—তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট বদলি আদেশ, পূর্ববর্তী কর্মস্থল, চাকরির মেয়াদ এবং নীতিমালার নির্ধারিত সীমা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা আরও অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিকভাবে নির্দিষ্ট মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত বা বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নন—এমন কিছু কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত কয়েকজন কর্মকর্তা সুবিধাজনক পদায়ন পেয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গোলাম মুর্তজা ও তাজউদ্দীন আহমেদ রূপালী ব্যাংকে কর্মরত থাকার সময় ব্যাংকটির বঙ্গবন্ধু পরিষদ- সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে তাদের উপস্থিতির তথ্য বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়। ২০২২ সালের জুলাইয়ে রূপালী ব্যাংক বঙ্গবন্ধু পরিষদের একটি অনুষ্ঠানে গোলাম মুর্তজার উপস্থিতির খবরও প্রকাশিত হয়েছিল।কারন তারা এ পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।
এরই মধ্যে গোলাম মুর্তজার বিরুদ্ধে অতীতে একজন নারীর করা নারীসংক্রান্ত অভিযোগের একটি নথি প্রতিবেদকের হাতে এসেছে বলে জানা গেছে। অভিযোগকারী ওই নারী দাবি করেছেন, বিয়ের আশ্বাস দিয়ে তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা হয়েছিল। অভিযোগের সঙ্গে কক্সবাজার যাতায়াতের বিমান টিকিট এবং নরসিংদীর একটি রিসোর্টে অবস্থানের তথ্য-সংবলিত নথি থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর বাংলা অ্যাফেয়ার্স-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ওই নারীর অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে অভিযোগকারী নারী গোলাম মুর্তজার বিরুদ্ধে বিয়ের আশ্বাস, কক্সবাজার যাতায়াত এবং নরসিংদীর একটি রিসোর্টে অবস্থানসহ বিভিন্ন অভিযোগ করেন। একই প্রতিবেদনে গোলাম মুর্তজা অভিযোগগুলো অস্বীকার করে এগুলোকে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা ছবি বলে দাবি করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলার কথাও দাবি করা হয়েছিল।
রাকাব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক হওয়ায় একজন ভারপ্রাপ্ত এমডির কর্মস্থলে উপস্থিতি, সরকারি অর্থে ভ্রমণ, আবাসন সুবিধা, দাপ্তরিক কক্ষের ব্যবহার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে নীতিমালা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে গোলাম মুর্তজার বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।পরে হোয়াটসআ্যাপে প্রশ্ন জানতে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর দেননি।তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
রাকাবের জিএম তাজউদ্দিন আহম্মেদ বলেন, এমডির অনুমতি ছাড়া গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভবনা।
রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাকে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ ওঠায় বিষয়গুলোকে ব্যক্তিগত বিরোধ বা পক্ষপাতের অভিযোগ হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই এবং প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা নির্ধারণ করাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য পথ বলে মনে করছেন ব্যাংকটির কর্মকর্তারা।


















