ইফতেখার আলম বিশাল: বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের ড্রাইভার (গাড়িচালক) নিয়োগ পরীক্ষায় নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মোবাইল ফোন নিয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের দায়ে মো. মামুন মণ্ডল নামে এক সরকারি গাড়িচালককে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তিনি রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের ড্রাইভার হিসেবে কর্মরত।
মামুন মণ্ডলের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই সাজা দেওয়ার তথ্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে উঠে এসেছে। চারটি নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ১১ জুলাই ঢাকার সরকারি তিতুমীর কলেজ কেন্দ্রে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের ড্রাইভার নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ওই পরীক্ষায় মামুন মণ্ডল পরীক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর রোল নম্বর ২৪০০০১৪২।
জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের প্রবেশপত্রে পরীক্ষার হলে মোবাইল ফোন, ঘড়ি, ইলেকট্রনিক ডিভাইসসহ যেকোনো ধরনের তথ্য আদান-প্রদানের যন্ত্র বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে অসদুপায় অবলম্বন, নকল বা নির্দেশনা ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতাও ছিল।
কিন্তু ওই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই মামুন মণ্ডল মোবাইল ফোন নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেন। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নথিতে দেওয়া তাঁর স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি বলেন, পরীক্ষাকেন্দ্রের গেটে চেক করার পরও তিনি মোবাইল নিয়ে হলে ঢোকেন। পরীক্ষা শুরুর পর পরীক্ষার্থীদের দেহ তল্লাশির সময় তাঁর পকেট থেকে মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়।
মামুন মণ্ডল তাঁর জবানবন্দিতে কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মোবাইল নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশের কথা স্বীকার করেন এবং নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চান। নথিতে তাঁর রোল নম্বরও ২৪০০০১৪২ উল্লেখ করা হয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, পরীক্ষার কেন্দ্রের প্রধান ফটক খোলার পর মাইকিং করে বারবার মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে প্রবেশে নিষেধ করা হয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেটও পরীক্ষার্থীদের এ বিষয়ে সতর্ক করেন। এরপর জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের কর্মকর্তারা পরীক্ষার হলগুলো পরিদর্শন এবং পরীক্ষার্থীদের দেহ তল্লাশি করেন।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, ওই পরীক্ষায় কয়েকজন পরীক্ষার্থী মোবাইল ফোন নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। তাঁদের মধ্যে দুইজন মোবাইল ব্যবহার করে গুগল, জেমিনি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-এর সহায়তায় প্রশ্নের উত্তর বের করার সময় ধরা পড়েন। তবে মামুন মণ্ডলসহ দুই পরীক্ষার্থী মোবাইল ব্যবহার করার আগেই তল্লাশির সময় ধরা পড়েন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের পকেট থেকে মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়।
দোষ স্বীকারের পর তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মামুন মণ্ডল প্রথমবারের মতো অপরাধ করেছেন উল্লেখ করে সাজা কমানোর আবেদনও করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
নথিপত্রে দেখা যায়, মামুন মণ্ডল বর্তমানে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর, রাজশাহী-তে ড্রাইভার পদে কর্মরত। তাঁর পরিচয়পত্রে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচয়, পদবি ‘ড্রাইভার’ এবং বর্তমান কর্মস্থল হিসেবে জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর, রাজশাহী উল্লেখ রয়েছে।
এ ছাড়া জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার দপ্তরের নথিতে দেখা যায়, তিনি ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নওগাঁ জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর থেকে অব্যাহতি নিয়ে রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে ড্রাইভার পদে যোগদান করেন। অর্থাৎ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সময় তিনি একটি সরকারি দপ্তরের কর্মরত চালক ছিলেন।
এ অবস্থায় সরকারি চাকরিতে থাকা একজন কর্মচারীর সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় নিষিদ্ধ মোবাইল নিয়ে প্রবেশ এবং এ কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালতে দণ্ডিত হওয়ার ঘটনায় তাঁর নিজ দপ্তরের পক্ষ থেকে কী ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
“মোবাইল নিয়ে পরীক্ষায় প্রবেশের কথা নিজেই স্বীকার করেছেন মামুন মণ্ডল; তবে নথি অনুযায়ী, মোবাইল ব্যবহার করে উত্তর বের করার আগেই তল্লাশির সময় তিনি ধরা পড়েন।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. মামুন মণ্ডল বলেন, তিনি বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। এর আগে কয়েকজন সাংবাদিক তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং তাঁদের ‘ম্যানেজ’ করার দাবি করেন তিনি। প্রতিবেদককেও রাজশাহীতে এলে ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলেন মামুন। পরে তিনি সংবাদটি প্রকাশ না করার অনুরোধ জানান।
রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ডিএলও) মো. আতোয়ার রহমান বলেন, “সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় দপ্তরকে না জানিয়ে তিনি ওই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। পরীক্ষাকেন্দ্রে মোবাইল ব্যবহারের ঘটনায় কারাদণ্ডের বিষয়টিও আমরা জানতে পেরেছি। এ ঘটনায় বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অধিদপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। এখন পরবর্তী ব্যবস্থা অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবে।”


















