চাকরিতে বয়স জালিয়াতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনদের সম্পদ নিয়ে দুদকে অভিযোগ
স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী: নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) পিএলসির ঈশ্বরদী কার্যালয়ের কর্মচারী সেলিম রেজার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, চাকরিতে বয়স কম দেখানো, জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার, বদলি ও নিয়োগে তদবির এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের তদন্ত চেয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) রাজশাহী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন পাবনার ঈশ্বরদীর শাহীন ফকির ও মো. জব্বর আলী ফকির।
অভিযোগে সেলিম রেজার চাকরিতে যোগদানের সময়কার বয়স ও শিক্ষাগত যোগ্যতার নথি যাচাই, পদ পরিবর্তনের প্রক্রিয়া, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং তার ও স্বজনদের সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের দাবি জানানো হয়েছে।
তবে সেলিম রেজা তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন। অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য—বিষয়গুলো তদন্ত করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সেলিম রেজা নেসকো বিদ্যুৎ শ্রমিক লীগের (রেজি. নং বি-২২১৬) ঈশ্বরদী শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ওই সময় রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে বদলি, নিয়োগ ও ঠিকাদারি-সংক্রান্ত কাজে তদবির করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে বিরোধী মতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তিনি আতঙ্ক সৃষ্টি করতেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১৪ সালে সেলিম রেজার দুই শ্যালক সোহেল রানা ও নাজমুল হোসেন নেসকোতে সাহায্যকারী পদে চাকরি পান। অভিযোগকারীরা তাদের চাকরি পাওয়ার প্রক্রিয়াও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, পরবর্তীতে ওই দুই ব্যক্তিও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে সম্পদ গড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সেলিম রেজার চাকরিজীবনের নথি নিয়েও অভিযোগে গুরুতর প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি ১৯৮৭ সালে তৎকালীন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে (পিডিবি) নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পরে ১৯৯৪ সালে অষ্টম শ্রেণি পাসের একটি সনদ ব্যবহার করে সহায়ক পদে পদ পরিবর্তন করেন।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, ওই সময় চাকরিতে যোগদানের বয়স এবং পরবর্তী সময়ে চাকরির মেয়াদ বাড়ানোর ক্ষেত্রে বয়স কম দেখানো হয়ে থাকতে পারে। এমনকি শিক্ষাগত সনদটি প্রকৃত কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি নথির মাধ্যমে যাচাই করার দাবি জানানো হয়েছে।
নেসকো ঈশ্বরদী কার্যালয়ের লাইনম্যান মো: আনোয়ার হোসেন বলেন, “সেলিম রেজা ১৯৮৭ সালে তৎকালীন পিডিবিতে নিরাপত্তা প্রহরী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন বলে আমরা জেনেছি। পরে ১৯৯৪ সালে বয়স কমিয়ে এবং শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার করে সাহায্যকারী পদে পদ পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নথিপত্র যাচাই করে দেখা দরকার।”
তার ভাষ্য, “যদি ১৯৮৭ সালে চাকরিতে যোগদানের তথ্য সঠিক হয়, তাহলে তার অবসর গ্রহণের সময় নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। বয়সের তথ্য যাচাই করা হলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।”
অভিযোগকারীরা বলছেন, বর্তমানে সেলিম রেজা নেসকো জাতীয়তাবাদী শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের (রেজি. নং ২২৩৩) একটি শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর তিনি নেসকো জাতীয়তাবাদী বিদ্যুৎ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের (রেজি. নং ২২৩৭) নেতাকর্মীদের হুমকি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাংগঠনিক অবস্থান পরিবর্তনের বিষয়টিও নেসকোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
তবে সেলিম রেজা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয়ে বলেন, তিনি একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। বর্তমানে তিনি যে শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত, সে বিষয়টিও তিনি অস্বীকার করেননি।
অভিযোগে সেলিম রেজার দুই শ্যালকের সম্পদ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তাদের একজন ঈশ্বরদীর জিগাতলা এলাকায় জমি কিনে বাড়ি নির্মাণ করেছেন। অপরজন আমিনপাড়া এলাকায় জমি কিনে বহুতল ভবন নির্মাণ করছেন।
অভিযোগকারীরা জানতে চেয়েছেন, তাদের ঘোষিত আয় ও বৈধ আয়ের উৎসের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না। এ কারণে আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, জমির দলিল এবং সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।
সোহেল রানা তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আমি কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। মিটার সংযোগের জন্য কোনো আবেদনকারী স্বেচ্ছায় খুশি হয়ে ৫০০ টাকা দিলে সেটি নিয়েছি। এর বাইরে কারও কাছ থেকে কোনো ধরনের অর্থ আদায় করিনি।”
সম্পদ অর্জনের বিষয়ে তিনি বলেন, “আমি জমি কিনেছি এবং বাড়ি নির্মাণ করছি—এটি সত্য। তবে এসবের অর্থের উৎস বৈধ।”
অভিযোগে সেলিম রেজার নাম পরিবর্তনের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২০১৮ সালে নেসকোতে যোগদানের পর তার নামের সঙ্গে ‘বিশ্বাস’ শব্দটি যুক্ত করা হয়। এর আগে চাকরির নথিতে শুধু ‘সেলিম রেজা’ নাম ব্যবহৃত হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
তবে নামের এই পরিবর্তন চাকরির নথি, জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ ও অন্যান্য সরকারি কাগজপত্রে কীভাবে হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না—তা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সেলিম রেজা বলেন, “আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, সেগুলো সঠিক নয়।”
তবে তিনি একসময় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেন। তার দুই শ্যালক নেসকোতে চাকরি পেয়েছেন—এ বিষয়টিও তিনি নিশ্চিত করেন।
অষ্টম শ্রেণি পাসের সনদ ব্যবহার ও বয়স কমিয়ে চাকরিতে যোগদানের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “১৯৯৪ সালে অনেকেই টিপসই দিয়ে চাকরি নিয়েছেন। তখন অনেকেরই লেখাপড়া ছিল না।”
তবে নিজের বিরুদ্ধে জাল শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার কিংবা বয়স জালিয়াতির অভিযোগ তিনি স্বীকার করেননি।
অভিযোগকারীরা বলছেন, বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগে যেসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো সরকারি নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা সম্ভব। এ কারণে সেলিম রেজার নিয়োগের সময়কার আবেদনপত্র, জন্মতারিখ ও বয়সের প্রমাণপত্র, শিক্ষাগত সনদ, পদ পরিবর্তনের নথি, চাকরির সার্ভিস বুক, অবসর সংক্রান্ত তথ্য এবং ২০১৮ সালে নেসকোতে যোগদানের সময় জমা দেওয়া কাগজপত্র যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে তার ও তার স্বজনদের নামে থাকা জমি, বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য এবং এসব সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস অনুসন্ধানেরও দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীরা দুদক, নেসকো কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
এখন দেখার বিষয়, দুদক ও নেসকো কর্তৃপক্ষ অভিযোগে উত্থাপিত বিষয়গুলো তদন্ত করে কী ধরনের তথ্য সামনে আনে। বিশেষ করে চাকরির বয়স, শিক্ষাগত সনদ, পদ পরিবর্তনের নথি এবং সম্পদ অর্জনের উৎস যাচাই হলেই অভিযোগগুলোর সত্যতা বা অসত্যতা স্পষ্ট হবে।

















