নিজস্ব প্রতিনিধি: দুস্বাস্থ্য সবার অধিকার—নিম্নআয়ের মানুষের চিকিৎসা নিশ্চিত করুক সরকার”—এই স্লোগানকে সামনে রেখে জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় নগর দরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ ২৭ আগস্ট বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের শাহমখদুম থানার পাবনাপাড়া বস্তিতে এ ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়। রাজশাহীর নগর দরিদ্র অধিকার বাস্তবায়ন কমিটি ও বারসিক (BARCIK)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই স্বাস্থ্যসেবা ক্যাম্পে বয়স্ক নারী-পুরুষ, শিশু ও বিভিন্ন বয়সী মোট ১০৩ জন নগর দরিদ্র মানুষ প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. জয়ন্ত প্রামানিক, এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য)। এ সময় রোগীদের বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা পরীক্ষা, চিকিৎসা পরামর্শ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রদান করা হয়।
আয়োজকরা জানান, পাবনাপাড়া বস্তিতে বসবাসকারী মানুষের একটি বড় অংশ জলবায়ু সংকট, নদীভাঙন, জীবিকা হারানোসহ গ্রামীণ জীবনের নানা সংকটের কারণে বহু বছর আগে কাজের সন্ধানে রাজশাহী শহরে এসে বসতি গড়ে তুলেছেন। বর্তমানে তারা রিকশাচালনা, দিনমজুরি, গৃহকর্ম, ক্ষুদ্র ব্যবসা, নির্মাণশ্রমসহ বিভিন্ন অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থেকে নগর অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। তবে সীমিত ও অনিয়মিত আয়, অনিরাপদ আবাসন, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের সংকট এবং চিকিৎসা ব্যয় বহনের অক্ষমতার কারণে তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নানা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হয়ে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। অতিরিক্ত গরম, অতিবৃষ্টি, জলাবদ্ধতা, মশার উপদ্রব ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে শিশু, প্রবীণ ও নারীদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান।
মেডিক্যাল ক্যাম্পে চিকিৎসা নিতে আসা ৭০ বছর বয়সী কুদ্দুস আলী বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, দিন আনি দিন খাই। এখন আর আগের মতো কাজ করার মতো শরীরের ক্ষমতা নেই। নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভুগি। কিন্তু চিকিৎসকের কাছে যাওয়া কিংবা নিয়মিত ওষুধ কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমাদের নেই। এ ধরনের স্বাস্থ্যসেবা যদি আমাদের মতো মানুষের জন্য আরও বেশি আয়োজন করা হয়, তাহলে আমরা অনেক উপকৃত হব।” কুদ্দুস আলী জ্বর, কাশি, শরীর ব্যথা ও রক্তচাপজনিত সমস্যার জন্য চিকিৎসাসেবা নেন। একইভাবে ৫৫ বছর বয়সী কৌহিনুর বেগম কাশি, সর্দি, চুলকানি ও দাউদের সমস্যা নিয়ে ক্যাম্পে চিকিৎসা নিতে আসেন। তিনি বলেন, “বেশি বৃষ্টি হলে আমাদের ঘরের আশপাশে পানি জমে যায়। ময়লা পানির মধ্যে চলাচল করতে হয়, আবার মশার উপদ্রবও বেড়ে যায়। তখন শরীরে নানা ধরনের সমস্যা দেখা দেয়। অসুখ বেশি হলে স্থানীয় ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে খাই, কিন্তু সব সময় তাতে কাজ হয় না। আমাদের মতো মানুষের ডাক্তার দেখানোর ভিজিট দেওয়ার সামর্থ্য নেই। রাজশাহী মেডিক্যালে গেলে সারা দিন চলে যায়, সেদিন আর কাজ করতে পারি না। কাজ না করলে খাব কী? আবার ডাক্তার দেখালে অনেক সময় দামি ওষুধ দেওয়া হয়, সেই ওষুধ কেনার সামর্থ্যও আমাদের নেই।”
ক্যাম্পে রাফি (৯), নিশান (১১), আয়শা (৩)-সহ বেশ কয়েকজন শিশুও চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করে। তাদের মধ্যে জ্বর, কাশি, সর্দি, পেটব্যথা, মাথাব্যথা, মুখে ঘা, চুলকানি, দাউদ, খাবারে অরুচিসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কথা উঠে আসে। এছাড়া বয়স্ক ও অন্যান্য বয়সী মানুষের মধ্যে হাঁটু ও কোমরের ব্যথা, রক্তচাপসহ নানা ধরনের শারীরিক সমস্যার জন্য চিকিৎসা ও পরামর্শ নেওয়া হয়।
রাজশাহীর নগর দরিদ্র অধিকার বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য সচিব নিলুফা ইয়াসমিন বলেন, “আমরা যারা নগরের নিম্নআয়ের মানুষ, আমাদের জীবন দিন আনি দিন খাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। পরিবারের খাবার ও দৈনন্দিন খরচ চালাতেই অনেক সময় হিমশিম খেতে হয়। ভালো চিকিৎসা নেওয়া বা নিয়মিত ওষুধ কেনার আর্থিক সামর্থ্য আমাদের অনেকেরই নেই। সরকার যদি নগরের নিম্নআয়ের মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ব্যবস্থা করে, তাহলে আমাদের কষ্ট অনেকটাই কমবে। কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে সরকার যে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে, তার পরিধি আরও বাড়ানো এবং সেবার মান আধুনিক ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।”
বারসিকের সহযোগী প্রোগ্রাম অফিসার অমিত সরকার বলেন, “অতিবৃষ্টি, অতিরিক্ত গরম, অতিরিক্ত ঠান্ডা, ঝড় কিংবা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন নিম্নআয়ের মানুষ। তারা যে ধরনের আবাসন ও পরিবেশে বসবাস করেন, তার কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত এবং মানুষসৃষ্ট পরিবেশ দূষণের প্রভাব তাদের ওপর আরও তীব্রভাবে পড়ে। ফলে তাদের স্বাস্থ্য ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। অথচ একটি নগরকে সচল রাখা, পরিচ্ছন্ন রাখা এবং নগরের দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনায় এই মানুষগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা সুস্থ ও ভালো থাকলে নগরও আরও ভালো থাকবে, সুন্দর ও কার্যকর থাকবে। তাই স্বাস্থ্য সুরক্ষা সবার অধিকার। জলবায়ু সংকটের সময়ে নিম্নআয়ের ও নগর দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের গুরুত্ব ও বিনিয়োগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।”


















