পলাতক নেতাদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যোগাযোগের অভিযোগ; রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয়নি, বলছেন প্রকৌশলী
নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজশাহী সফর উপলক্ষে বিভিন্ন অনুষ্ঠানস্থলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ঢাকা থেকে তিনটি ব্যাকআপ জেনারেটর আনার দায়িত্ব দেওয়া হয় জাতীয় শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর হোসেনকে। তিনি রাজশাহী নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানির (নেসকো) ডিভিশন-৪-এর স্টোরকিপার পদে কর্মরত। আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন হিসেবে পরিচিত শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একজন নেতাকে প্রধানমন্ত্রীর সফরকেন্দ্রিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ায় নেসকোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও দায়িত্ব বণ্টনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জাহাঙ্গীর হোসেনের বিরুদ্ধে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যোগাযোগ বজায় রাখার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া রাজশাহী মহানগর শ্রমিকলীগের সাধারণ সম্পাদক সোহেলের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। সোহেল বর্তমানে রংপুর নেসকোতে কর্মরত। তবে কথিত হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপের সদস্যদের পরিচয়, যোগাযোগের ধরন এবং কথোপকথনের বিষয়বস্তু স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব বণ্টন ও জবাবদিহির বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর সফরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় ও নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির নেতারা।
নেসকোর ডিভিশন-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মারুফুল হক গত ১৫ অক্টোবর বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) উপপরিচালক, জেনারেশন ডিজেলের কাছে একটি চিঠি দেন। এতে প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অনুসরণের লক্ষ্যে অপারেটিং জনবলসহ ১৫০, ১০০ ও ৫০ কেভিএ ক্ষমতার তিনটি ব্যাকআপ জেনারেটর নেসকোর স্টোরকিপার-বি মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের কাছে হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
চিঠির ভিত্তিতে জাহাঙ্গীর হোসেন তিনটি ট্রাকে করে ঢাকার পোস্তগোলায় পিডিবির সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে জেনারেটরগুলো রাজশাহীতে নিয়ে আসেন। পরে সেগুলোর একটি সার্কিট হাউসে, একটি ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে এবং অন্যটি ধর্মসভায় স্থাপন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তবে জেনারেটরগুলোর ক্ষমতা নিয়ে পাওয়া তথ্যে অসংগতি রয়েছে। চিঠিতে ১৫০, ১০০ ও ৫০ কেভিএর কথা উল্লেখ থাকলেও অন্য তথ্যে ভিন্ন ক্ষমতার জেনারেটরের কথা এসেছে। কোন স্থানে কত ক্ষমতার জেনারেটর স্থাপন করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
নেসকোর সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুব আলম চৌধুরী বলেন, ‘সময় স্বল্পতার কারণে জাহাঙ্গীর হোসেনকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। পিডিবির নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ২১ জনের একটি দল জেনারেটরগুলোর সঙ্গে রাজশাহীতে এসেছে। তাঁরাই সেখানে কাজ করছেন। জাহাঙ্গীর বা অন্য কেউ ডিউটি করছেন না।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিনি কোন রাজনৈতিক দল করেন, সেটা আমরা দেখিনি। তিনি একজন কর্মচারী। সেই হিসেবে তিনি জেনারেটর গ্রহণ করেছেন, অন্য কিছু নয়।’
নেসকোর ডিভিশন-৪-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মারুফুল হক বলেন, ‘জেনারেটরগুলো ইতিমধ্যে এসএসএফের সদস্যরা পরিদর্শন করে গেছেন। জাহাঙ্গীর হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যাপারে বলতে গেলে, তাড়াহুড়া করে জেনারেটর নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হওয়ায় বিষয়টি আমি বুঝতে পারিনি। তা ছাড়া পিডিবির নিজস্ব জনবল দিয়ে জেনারেটরগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।’
কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সময়ের স্বল্পতার কারণে জাহাঙ্গীরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং জেনারেটর পরিচালনার কাজ করছে পিডিবির নিজস্ব জনবল। তবে দায়িত্ব বণ্টনের আগে রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট কোনো যাচাই করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে তাঁদের বক্তব্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
রাজশাহী মহানগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি নজরুল হুদা বলেন, ‘নেসকোর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন নেতাকে দিয়ে জেনারেটর আনার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে একজন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া যেত। কেন তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হলো, সে বিষয়ে আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চাইব।’
নেসকোর নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন) আফাজ উদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। আপনি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) সঙ্গে কথা বলেন।’
নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘আমি দায়িত্ব পালন করেছি। এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারব না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেসকোর একাধিক কর্মকর্তা কর্মচারীরা বলেন, জাহাঙ্গীর হোসেনের সঙ্গে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের হোয়াটসঅ্যাপ যোগাযোগ এবং রাজশাহী মহানগর শ্রমিকলীগের সাধারণ সম্পাদক সোহেলের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগের অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট গ্রুপের সদস্যদের পরিচয়, যোগাযোগের প্রকৃতি ও প্রাসঙ্গিক তথ্য যাচাই করা গেলে অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে প্রশ্ন রয়েছে, শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অর্থ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত একজন কর্মচারীকে প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে জেনারেটর আনার দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে নেসকো কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে? সময়ের স্বল্পতা কি এ দায়িত্ব বণ্টনের একমাত্র কারণ ছিল, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো প্রশাসনিক বিবেচনা ছিল? এসব প্রশ্নের জবাব পেতে নেসকোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর সফর উপলক্ষে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে জেনারেটর আনার প্রয়োজনীয়তা থাকতে পারে। তবে এমন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম অনুসরণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি দায়িত্ব বণ্টনের প্রক্রিয়াও তাই খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


















