নিজস্ব প্রতিবেদক: ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছর শাসন আমলে সারাদেশের ন্যায়
শিক্ষা নগরী নামে খ্যাত রাজশাহীর শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধংস করে দেয়া হয়েছে। পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষার সাথে লুটপাট, দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য করে দেউলিয়া করে দেয়া হয়েছে
অনেক প্রতিষ্ঠান। এমন দেউলিয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি রাজশাহী নগরীর আলহাজ্ব সুজাউদ্দৌলা কলেজ।
পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের এক কথিত রাজনৈতিক অধ্যক্ষ গত ১০ বছরে আলহাজ্ব সুজাউদ্দৌলা কলেজের লাল বাতি জালিয়ে দিয়ে পালিয়েছেন। এই অধ্যক্ষের কারণে এক বছরেও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি কলেজটি। কলেজের শিক্ষার পাশাপাশি লুটপাট করে ধংস করে দেয়া হয়েছে অর্থনৈতিক অবস্থাকেও। যার কারণে এ কলেজে পরপর দুটি অডিটে মেলেনি দশ বছরের আয়-ব্যয়ের হিসাব। কোটি টাকার হিসাব মিলছে সুজাউদ্দৌলা কলেজের।
জানা গেছে, রাজশাহী নগরীর তেরখাদিয়ায় অবস্থিত আলহাজ্ব সুজাউদ্দৌলা কলেজ ১৯৯৫ সালের ১০ মার্চ প্রতিষ্ঠিত। মূলত বিএনপির শাসন আমলে কলেজটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। জমি দাতার নামেই এই
কলেজের নামকরণ করা হয় আলহাজ্ব সুজাউদ্দৌলা কলেজ। রাজশাহীর অন্যান্য কলেজের মত এ কলেজের শিক্ষার মান ভাল ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আশার পর এই কলেজে অশনি সংকেত শুরু হয়। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে আওয়ামী পন্থী ব্যক্তিদের অধ্যক্ষের মত পদে দায়িত্ব দেয়ার পর শুরু হয় দুর্নীতি ও লুটপাট। লুটপাট, অনিয়ম, দুর্নীতির করে ১০বছরে শেষ করে দেয়া হয়েছে আলহাজ্ব সুজাউদ্দৌলা কলেজের সুনাম।
জানা গেছে, ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর আলহাজ্ব সুজাউদ্দৌলা কলেজে আওয়ামী লীগের দলীয় সুপারিশে অধ্যক্ষ হিসাবে নিয়োগ পান এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান ও ওরফে মাঞ্জাল। ওই বছরের ৯ নভেম্বর তিনি এ কলেজে যোগদান করেন। এরপর ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট তিনি পদত্যাগ করেন। এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। আগে তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন।
দলীয় পদ থাকার কারণে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে কলেজে তেমন আসতেন না। দলীয় প্রোগ্রাম নিয়ে বেশি সময় পার করতেন। তিনি সপ্তাহে যে দুএকদিন কলেজে আসতেন, সেটা টাকার জন্য। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে শিক্ষকদের সাথে খারাপ আচরণ, বহিরাগতদের নিয়ে তার রুমে আড্ডাবাজি, শিক্ষকদের মধ্যে গ্রুপিং করানো ছিল এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানের কাজ। বলা যায়, সুজাউদ্দৌলা কলেজ ছিল এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানের একটি দলীয় অফিস। এছাড়া তিনি নিজেকে অধ্যক্ষ পরিচয় দেয়ার পরিবর্তে দলীয় পদের পরিচয় দিতেই বেশি পছন্দ করতেন।
কলেজের কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, সুজাউদ্দৌলা কলেজে এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান অধ্যক্ষ হিসাবে যোগদানের তারিখ ২০১৬ সালের ৯ নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট পর্যন্ত একটি অভ্যান্তরিণ অডিট হয়। সেই অডিটে ধরা পড়ে এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানের লুটপাটের চিত্র। সুজাউদ্দৌলা কলেজে টানা প্রায় দশ বছরের চাকরি জীবনে সাবেক অধ্যক্ষ এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান ১ কোটি ৭৩ লাখ ৫২ হাজার টাকা আত্মসাত করেছেন।
অডিটে এই বিপুল পরিমান টাকার কোনো হদিস মেলেনি। শুধু এই টাকাই নয়, শিক্ষক নিয়োগ বাণিজ্যে টাকাও এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান নিজের পকেটে ভরেছেন। গত ৯ ও ১০ সেপ্টেম্বর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে অডিট করা হয়েছে। অডিট অফিসারের ভাষ্যমতে, টানা দশ বছরের টাকার কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি সুজাউদ্দৌলা কলেজে। ব্যাংক একাউন্টে লেনদেন নেই। ভর্তি ফি, শিক্ষার্থীদের বেতন থেকে শুরু করে যাবতীয় টাকা লেনদেন হয়েছে ব্যক্তিগতভাবে।
গত দশ বছর সাবেক অধ্যক্ষ এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান কোনো টাকা ব্যাংকে রাখেননি। এমন কি কোনো হিসাবের খাতাও নেই। যে টাকা আয় হয়েছে তার সামান্য কিছু কলেজের জন্য ব্যয় করে বাকি টাকা গেছে অধ্যক্ষ এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানের পকেটে। অধ্যক্ষ এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানের লুটপাটের সাথে কয়েকজন শিক্ষকও জড়িত রয়েছেন। সাবেক অধ্যক্ষের সাথে ছিলেন ওই কলেজের ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের প্রভাষক মাওলানা হাবিবুর রহমান, গণিতের প্রভাষক আব্দুর রাজ্জাক, জীব বিজ্ঞানের প্রভাষক ওয়াহেদ আলী। সাবেক অধ্যক্ষ এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানের নেই। কিন্তু এই চার শিক্ষক এখনো তার সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। এমন কি আবারো এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানকে ফিরে আনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এমন অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে। এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানের সহযোগিদের কারণে বড় দুর্নীতি, লুটপাট হলেও বিষয়টি প্রকাশ হয়নি। অডিট অফিসারের দেয়া তথ্যমতে, সাবেক অধ্যক্ষ কলেজের টাকাই আত্মসাত করেননি, সাথে শিক্ষার পরিবেশও নষ্ট করেছেন।
কলেজে যে পরিমান শিক্ষার্থী থাকার কথা সেটি নেই। অন্যান্য কাগজপত্রেও ব্যাপক গড়মিল পাওয়া গেছে। আর এসব করেছেন সাবেক অধ্যক্ষ এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান। যদিও এ বিষয় নিয়ে কলেজের কথিত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন সাবেক অধ্যক্ষ এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ করেছেন। কারণ এই ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এক সময় সাবেক অধ্যক্ষ এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানের সহযোগি ছিলেন। এখনো তিনি সাবেক অধ্যক্ষের হয়েই কাজ করছেন।
শিক্ষকরা বলছেন, নিজের দোষ ঢাকার জন্য কথিত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আলমগীর হোসেন ২০২৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে দুদকে একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। কলেজের শিক্ষকরা বলছেন, কলেজের যে টাকা আয় হতো সব যেতো সাবেক অধ্যক্ষ এএসএম মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে। কলেজের যা প্রায়োজন হতো তিনি নিজে, কখনো তার মনোনিত শিক্ষক বা ব্যক্তিকে দিয়ে কিনে নিতেন। এতে দেখা যেতো, যেটা ব্যয় হতো, তার চেয়ে ডাবল খাতায় লেখা হতো। এভাবেই তিনি দশটি বছর পার করেছেন। তিনি সব শিক্ষকের সাথে কথাবার্তা বলতেন না। নিজের মত করে চলতেন। সাবেক অধ্যক্ষের রুম ছিল আওয়ামী লীগ নেতাদের অড্ডাখানা।
শিক্ষকরা বলছেন, গত ১০বছরে অধ্যক্ষ এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান এ কলেজের সবকিছু শেষ করে দিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে সুজাউদ্দৌলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এএসএম মোস্তাফিজুর রহমান রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কলেজের টাকা লুটপাটের বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, আমাকে মব সৃষ্টি করে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছে। আমার হিসাবের কাগজপত্র পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। যার কারণে কত টাকা আয় ও ব্যয় সেই হিসাব নেই। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, আমি কলেজের উন্নয়ন করেছি। কিন্তু এই একটি বছরে কলেজের কি উন্নয়ন হয়েছে।





