• রাজশাহী, বাংলাদেশ
  • ১৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
  • নিবন্ধন এর জন্য আবেদনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • news@sonybangla.news
  • ০১৭৭৫-৫৮৯৫৫৮

চারঘাটে জলাবদ্ধতায় কৃষকদের বিপর্যয়: আমন আবাদ অনিশ্চিত, ক্ষতির আশঙ্কা ৩ কোটি টাকা

প্রকাশ: রবিবার, ১০ আগস্ট, ২০২৫ ২:৪৭

চারঘাটে জলাবদ্ধতায় কৃষকদের বিপর্যয়: আমন আবাদ অনিশ্চিত, ক্ষতির আশঙ্কা ৩ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষকরা এবার চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। টানা বৃষ্টিপাতে ফসলি জমি তলিয়ে গেছে, আমন চাষে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে চারা তুলছেন কৃষক আব্দুল কাদের (৫৭)। তিনি বলেন, “সাড়ে ছয় বিঘা জমিতে ধান রোপণ করব ভেবেছিলাম। কিন্তু জমি এখন পানির নিচে। হাঁটুপানিতে চারা নষ্ট হয়ে গেছে। যতটুকু চারা বেঁচে আছে, সেগুলোই রক্ষা করার চেষ্টা করছি। তবে নতুন করে চারা কিনে আবাদ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”

আব্দুল কাদেরের মতো অসংখ্য কৃষক এ সংকটে পড়েছেন। কখনো উঁচু জমি হিসেবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলের বিলগুলো এবার অতিবৃষ্টির কারণে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় কৃষকদের মতে, এই জলাবদ্ধতার পেছনে দায়ী অপরিকল্পিত পুকুর খনন, খাল ভরাট, দখল এবং কালভার্টের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়া। এর ফলে শুধু ফসল নয়, বসতবাড়িও প্লাবিত হয়েছে।

নিজেদের চেষ্টায় পানি নিষ্কাশন
জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি পেতে কৃষকরা নিজেরাই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন—শ্যালো মেশিন বসানো, মাটি কেটে নালা তৈরি করা এমনকি প্রধান সড়ক কেটে পানি বের করার চেষ্টা করছেন তারা।
বালিয়াডাঙার কৃষক রফিকুল ইসলাম বলেন, “পুকুর খননের পর তার পাড়ে কলাগাছ লাগিয়ে পানি চলাচলের সব পথ বন্ধ করে দিয়েছে। হাঁটুপানিতে জমি পড়ে আছে, এখন কীভাবে ধান লাগাবো?”

চারঘাট উপজেলা কৃষি অফিস জানিয়েছে, জলাবদ্ধতার কারণে অন্তত ৮০০ হেক্টর জমিতে আমন চাষ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আগস্ট মাসের শেষ দিকে পানি নেমে গেলে কিছু জমিতে রোপণ সম্ভব হলেও প্রায় ৩০০–৪০০ হেক্টর জমি চাষের বাইরে থেকে যেতে পারে।
তবে কৃষকদের দাবি, বাস্তব অবস্থা আরও ভয়াবহ। তাঁদের মতে, অন্তত ১,০০০ হেক্টর জমি এখনও পানির নিচে। অনেকের বসতঘরেও পানি উঠে গেছে।

বৃষ্টিপাত রেকর্ড, খাল-পুকুরের দখল সংকট বাড়িয়েছে
রাজশাহী আবহাওয়া অফিস জানায়, ২৯ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত সাত দিনে ১৬৭.৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা এ মৌসুমে সর্বোচ্চ।
উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত এক দশকে চারঘাটে ১,৪৭২টি নতুন পুকুর খনন হয়েছে, যার বেশিরভাগই তিন ফসলি জমিতে এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে। ফলে পানিনিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

শলুয়া গ্রামের কৃষক সবুর আলী বলেন, “আগে বৃষ্টির পানি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বড়াল নদীতে চলে যেত। এখন খাল দখল হয়ে যাওয়ায় সেই পথ নেই।”
চারঘাটে কাগজে-কলমে ২১টি খালের কথা থাকলেও বাস্তবে ১৬টির কোনো অস্তিত্ব নেই। বাকি পাঁচটি খালও দখল ও দূষণের কারণে অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

চামটা গ্রামের কৃষক মুক্তা হোসেন জানান, “আমরা নিজেরাই মিলে খাল কাটার চেষ্টা করছি যেন পানি নিষ্কাশন হয়।”
সরদহ ইউনিয়নের বাসিন্দা সুমন আলী বলেন, “কালভার্টের মুখগুলো বন্ধ হয়ে আছে, পানি যেতে পারছে না। খাল নেই, পুকুরে সব পথ বন্ধ।”

উপজেলা আদর্শ কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম বলেন, “১,০০০ হেক্টর জমি চাষ না হলে কমপক্ষে ২৫ হাজার মণ ধান উৎপাদন হবে না। প্রতি মণ ১,০০০–১,২০০ টাকা ধরলে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৩ কোটি টাকা।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই, অপরিকল্পিত পুকুর খনন বন্ধ করা হোক এবং দখলকৃত খালগুলো উদ্ধার করে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখা হোক।”

চারঘাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আল মামুন হাসান জানান, “আমরা কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করছি যাতে কোনো জমিই চাষের বাইরে না থাকে। উঁচু জায়গায় অতিরিক্ত বীজতলা তৈরি করা হয়েছে। আশা করছি, আগস্টের শেষের দিকে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হবে।”

চারঘাটে পুকুর খনন ও খাল দখলের ফলে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে ফসলি জমি, বসতবাড়ি, ও কৃষকদের জীবিকার ওপর। এটি কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার ফল। এখনই যদি যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে ক্ষতির মাত্রা আরও বাড়বে—যা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ

 



প্রকাশক ও সম্পাদক: মো: ইফতেখার আলম বিশাল

যোগাযোগ: শিরোইল গৌধুলী মার্কেট ঢাকা বাস টার্মিনাল বোয়ালিয়া রাজশাহী। ই-মেইল: smbishal18@gmail.com, মোবাইল:০১৭৭৫-৫৮৯৫৫৮