নিজস্ব প্রতিবেদক: নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো)-এর ২০১৮ ও ২০১৯ সালের নিয়োগ কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রে অসঙ্গতি ও ঘাটতির তথ্য সামনে এসেছে। বিশেষ করে বর্তমান উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন) মো. রহমত উল্লাহ-আল-ফারুকের নিয়োগসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি মূল নথি অনুপস্থিত থাকার তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাবেক নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ গোলাম আহাম্মদ অতিরিক্ত দায়িত্বে নির্বাহী পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন পদে নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। ওই সময় ব্যবস্থাপক (মানবসম্পদ ও প্রশাসন) পদে নিয়োগ পান বর্তমান উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. রহমত উল্লাহ-আল-ফারুক।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি সৈয়দ গোলাম আহাম্মদের অবসর-পরবর্তী আর্থিক সুবিধা ও পেনশন-সংক্রান্ত আবেদন পর্যালোচনার সময় তার দায়িত্বকালীন বিভিন্ন কর্মকাণ্ড যাচাইয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে গঠিত কমিটির কাছে পাঠানো তথ্য-উপাত্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সেখানে দেখা যায়, অন্যান্য নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের তুলনায় রহমত উল্লাহ-আল-ফারুকের নিয়োগসংক্রান্ত একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মূল নথি খুঁজে পাওয়া যায়নি।
অনুপস্থিত নথির তালিকায় রয়েছে—বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) কর্তৃক প্রস্তুত লিখিত পরীক্ষার ফলাফল, মৌখিক পরীক্ষার নম্বরপত্র, টেবুলেশন শিট, মৌখিক পরীক্ষার হাজিরা শিট এবং নিয়োগ অনুমোদনসংক্রান্ত বোর্ড সভার কার্যবিবরণী।
প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়োগের বৈধতা ও স্বচ্ছতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে এসব নথিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় একজন প্রার্থী কত নম্বর পেয়েছেন, মেধাতালিকায় তার অবস্থান কী ছিল এবং পরিচালনা পর্ষদ কীভাবে নিয়োগ অনুমোদন দিয়েছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতেই একটি নিয়োগের বৈধতা নির্ধারিত হয়। ফলে এসব নথির মূল কপি অনুপস্থিত থাকা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, গুরুত্বপূর্ণ এসব নথি না থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা পরবর্তীতে একাধিক পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে উপ-মহাব্যবস্থাপক পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নেসকোর উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন) মো. রহমত উল্লাহ-আল-ফারুক কোনো ব্যাখ্যা দিতে রাজি হননি। তিনি বলেন, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো বক্তব্য দিতে পারব না। নিজের নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্রের অনুপস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করার পরামর্শ দেন।
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, যে কর্মকর্তা নিজেই প্রশাসন ও মানবসম্পদ বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন, তার নিজের নিয়োগসংক্রান্ত নথি অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা না দেওয়া কি স্বচ্ছতার পরিচায়ক?
অন্যদিকে নেসকোর মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও মানবসম্পদ উন্নয়ন) রফিকুল ইসলাম দাবি করেছেন, নিয়োগসংক্রান্ত নথিপত্র কোম্পানির সচিবালয়ে পাঠানো হতো এবং নিয়োগ কার্যক্রমও সেখান থেকেই সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানান, বুয়েট নিয়োগ পরীক্ষা নিয়েছিল। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সন্দেহের কোনো কারণ নেই।
তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, বুয়েট পরীক্ষা নিয়েছিল—এ তথ্য নিয়োগ প্রক্রিয়ার একটি অংশের ব্যাখ্যা মাত্র। কিন্তু লিখিত পরীক্ষার ফলাফল, মৌখিক পরীক্ষার নম্বরপত্র, টেবুলেশন শিট ও বোর্ড সভার কার্যবিবরণীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নথি কোথায়, কেন নেই এবং কীভাবে হারিয়ে গেল—সে প্রশ্নের কোনো উত্তর তার বক্তব্যে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে নেসকোর বিদায়ী নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) সৈয়দ গোলাম আহাম্মদ বলেন, নিয়োগসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ মূল নথি না থাকার কোনো কারণ নেই। এসব নথি অবশ্যই সংরক্ষিত থাকার কথা। যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তারা ইতোমধ্যে এক বা একাধিক পদোন্নতি পেয়েছেন। মূল নথি না থাকলে পদোন্নতি কীভাবে হয়েছে, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
তার এই বক্তব্যের পর নথি সংরক্ষণ, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, যদি সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ মূল নথিগুলো অনুপস্থিত থাকে, তাহলে শুধু ওই নিয়োগ নয়, পরবর্তী পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোর ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।
এদিকে নেসকোর সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী জাকিউল ইসলামসহ কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করেছে। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে নিয়োগসংক্রান্ত বিভিন্ন নথিপত্রও চাওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ নথির অনুপস্থিতির বিষয়টি নতুন মাত্রা যোগ করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এখন গঠিত কমিটির তদন্তে এসব নথির প্রকৃত অবস্থান, অনুপস্থিতির কারণ এবং এর পেছনে কোনো গাফিলতি বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটিই দেখার অপেক্ষা।





