অনলাইন ডেস্ক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস তাহের আহমেদ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি একই বিভাগের সহকারি অধ্যাপক মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন চুড়ান্তভাবে বরখাস্ত করেছে কর্তৃপক্ষ। গত ২৩ মে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আবদুস সালাম সাক্ষরিত এক আদেশে ২০০৮ সালের ২২ মে থেকে শিক্ষকের পদ থেকে তাকে চুড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক আবদুস সালামের স্বাক্ষর করা ইস্যুকৃত সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল মামলা নং- ৩৮/০৭, এম.জি.আর. নং- ৯০/০৬ ও মতিহার থানার ২/০৬ নং মামলায় মহামান্য বিজ্ঞ আদালত আপনাকে মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রদান করেন। মহামান্য সুপ্রীম কোর্ট উক্ত মৃত্যুদন্ডাদেশ বহাল রাখায় সরকারী কর্মচারী (শৃংখলা ও আপীল) বিধিমালা ২০১৮ এর ৪২ ধারা অনুযায়ী মৃত্যুদন্ডাদেশ প্রদানের তারিখ অর্থাৎ ২২-০৫-২০০৮ তারিখ হতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এর পদ ও চাকরি থেকে আপনাকে চূড়ান্তভাবে (Dismissed) বরখাস্ত করা হলো।’
রেজিস্ট্রার আবদুস সালাম জানিয়েছেন, ২০০৮ সালের ২২ মে নিম্ম আদালতে সাজা হলে অধ্যাপক মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিনকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। উচ্চ আদালত তার সাজা বহল রাখায় তাকে চুড়ান্তভাবে বরখাস্ত করা হয়।
তিনি বলেন, কেউ যদি চূড়ান্তভাবে দোষী সাব্যস্ত হয়, তাহলে সেই তারিখ থেকে তিনি বরখাস্ত হয়ে যান। এক্ষেত্রে ড. মহিউদ্দীন চূড়ানন্তভাবে দন্ডিত আসামী হওয়ায় আইন মেনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভায় তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
এদিকে, রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার নিজাম উদ্দিন জানিয়েছেন, প্রাণভিক্ষা নাকচের চিঠি গত ৬ জুলাই ডাকযোগে কারাগারে এসে পৌঁছায়। কারা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রায় ছয় মাস আগে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছিলেন আসামিরা। সে আবেদন গত মাসে রাষ্ট্রপতি নাকচ করেন। এর মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সহকারি অধ্যাপক মিয়া মোহাম্মদ মহিউদ্দিন ও নিহত অধ্যাপক তাহেরের বাসার কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলমের পক্ষে চলমান সব দাপ্তরিক ও আইনি প্রক্রিয়া শেষ হয়।
তিনি বলেন, জেল কোড অনুযায়ী চিঠি হাতে পাওয়ার ২১ থেকে ২৮ দিনের দিনের মধ্যে যে কোনো দিন ফাঁসি কার্যকর করা হবে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামিকেই কনডেম সেলে রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যেই পরিবারের সদস্যরা দেখা করতে শুরু করেছে। তবে শেষ দেখা করার জন্য দিন আসামীদের পরিবারকে এখনো জানানো হয়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২ মার্চ এই আসামির ফাঁসি এবং যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামির রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করেন সুপ্রিমকোর্ট। নিম্ন আদালতে দুজনের মৃত্যুদণ্ডের যে রায় দেওয়া হয়েছিল তাই বহাল থাকে আপিলে, খারিজ হয় রিভিউ আবেদনও। এরপর রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা ছাড়া আর কোনো পথই খোলা ছিল না তাদের। এরপরও দুজনের ফাঁসি কার্যকর স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে গত ৭ মে ফের রিট আবেদন করেন তাদের স্বজনরা। যদিও উত্থাপিত হয়নি মর্মে পরবর্তী সময়ে সে আবেদনও খারিজ করে দেন হাইকোর্ট।
২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক কোয়ার্টার থেকে নিখোঁজ হন অধ্যাপক ড. এস তাহের আহমেদ। বাসাটিতে তিনি একাই থাকতেন। কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলম তার দেখাশোনা করতেন। পরদিন বাসাটির পেছনের ম্যানহোল থেকে উদ্ধার করা হয় তার মরদেহ। ৩ ফেব্রুয়ারি তার ছেলে সানজিদ আলভি আহমেদ বাদি হয়ে রাজশাহীর মতিহার থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।
এদিকে অধ্যাপক তাহেরের করা একটি জিডির সূত্র ধরে বিভাগের শিক্ষক মহিউদ্দিন ও রাবির ইসলামী ছাত্রশিবিরের তৎকালীন সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহী, কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীরসহ আটজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর ৫ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তারদের মধ্যে তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
জবানবন্দিতে তারা বলেন, অধ্যাপক তাহের বিভাগের একাডেমিক কমিটির প্রধান ছিলেন। একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মহিউদ্দিন অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য কমিটির সুপারিশ চেয়ে আসছিলেন। কিন্তু বাস্তব কারণে অধ্যাপক তাহের তা দিতে অস্বীকার করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মহিউদ্দিন হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। বালিশ চাপায় খুনের পর বাড়ির ভেতরে থাকা চটের বস্তায় ভরে অধ্যাপক তাহেরের লাশ বাসার পেছনে নেওয়া হয়। লাশ গুমের জন্য জাহাঙ্গীররের ভাই নাজমুল আলম ও নাজমুলের স্ত্রীর ভাই আবদুস সালামকে ডেকে আনা হয়। তাদের সহায়তায় বাসার পেছনের ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে অধ্যাপক তাহেরের লাশ ফেলে দেওয়া হয়।
২০০৭ সালের ১৭ মার্চ শিবির নেতা মাহবুব আলম সালেহীসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ। বিচার শেষে ২০০৮ সালের ২২ মে রাজশাহীর দ্রুত বিচার আদালত চারজনকে ফাঁসি ও দুজনকে খালাস দেন। দণ্ডিত অন্যরা হলেন জাহাঙ্গীরের ভাই নাজমুল ও তার স্ত্রীর ভাই সালাম। তবে বিচারে খালাস পান ছাত্রশিবিরের নেতা সালেহী ও আজিমুদ্দিন মুন্সি।
পরবর্তীতে দণ্ডপ্রাপ্তরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন। আপিল বিভাগ মহিউদ্দিন ও জাহাঙ্গীরের রায় বহাল রাখলেও নাজমুল ও সালামের রায় কমিয়ে যাবজ্জীবন করেন। কিন্তু তাদের দণ্ড বৃদ্ধি চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। শুনানি শেষে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের রায়ই বহাল রাখেন।
সনি বাংলা ডট কম/ইআবি





