রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহী মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের হিসাব শাখায় প্রকাশ্যে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। ঘুষ লেনদেনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
‘রফিক উইথ ন্যাচার’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশিত ভিডিওটিতে দাবি করা হয়, শিক্ষা বোর্ডে টেবিল-চেয়ার পাওয়া থেকে শুরু করে ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন ফাইল জমা দিতেও ঘুষ দিতে হয়। পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয়, হিসাব শাখা ও নিবন্ধন শাখা—উভয় জায়গাতেই নিয়মিত ঘুষ আদায় করা হয় এবং একজন গোপনে সেই দৃশ্য ধারণ করেন।
ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায়, দুটি লম্বা টেবিলের বিপরীত পাশে তিন-চারজন সেবাগ্রহীতা দাঁড়িয়ে আছেন। টেবিলের পাশে তিনটি চেয়ার থাকলেও একটি চেয়ারে বসে আছেন শিক্ষা বোর্ডে কর্মরত এক ব্যক্তি। এক সেবাগ্রহীতা নিজের কোটের পকেট থেকে টাকা বের করে টেবিলে বসে থাকা ওই ব্যক্তির হাতে তুলে দেন। তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই টাকা হাতে নিয়ে নিজের জ্যাকেটের পকেটে রেখে দেন। এরপর টাকা প্রদানকারী ব্যক্তি স্থান ত্যাগ করেন।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর ফেসবুকে নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। রহমান মোস্তাফিজ নামে একজন মন্তব্য করেন, “শিক্ষা বোর্ডের ঘুষটাকে ঘুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না; এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ারই অংশ।”
মোঃ মমিনুল হক ও মোক্তার আলী লেখেন, “এরা এটাকে নিয়ম মনে করে খুব সাবলীলভাবে চেয়েই নেয়; এটা ওদের নিয়মিত কাজ হয়ে গেছে। দেশটা ওদের বাপের।”
মিজান আলী ও তাহারুল ইসলাম মন্তব্য করেন, “ভেরি স্যাড। শিক্ষা বোর্ডে এটা নতুন কিছু না।”
এমি মিজান লিখেছেন, “এটা তাদের অধিকার।”
এদিকে রাজশাহীর একটি অনলাইন পত্রিকার ফেসবুক পেজে দাবি করা হয়, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের নিবন্ধন শাখায় প্রতিবছর অন্তত ৩০ লাখ টাকা ঘুষ আদায় করা হয়। শিক্ষার্থীদের নিবন্ধন তালিকা জমা দিতে গেলেই ঘুষ দিতে হয়। ওই পোস্টের মন্তব্য ঘরে সারোয়ার জাহান লিখেছেন, “বাইরে কম্পিউটারের দোকানে এদের এজেন্টদের যাতায়াত আছে। এখান থেকেই বেশি লেনদেন হয়।”
প্রসঙ্গত, রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডকে ঘিরে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। প্রায় প্রতিবছরই বোর্ডের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কখনো টেন্ডারবিহীন ঠিকাদারি কাজ, কখনো টেন্ডারের মাধ্যমে পরিচিত ব্যক্তিদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ, কখনো কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হট্টগোল ও হাতাহাতি, আবার কখনো কাগজ ও কার্টন বিক্রিতে অনিয়ম, টেন্ডার ছাড়া ব্যয়বহুল রাস্তা নির্মাণ এবং এসব ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার নজিরও রয়েছে। বিদ্যালয় শাখাসহ বিভিন্ন দপ্তরে লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে সাধারণ সেবাগ্রহীতারা দীর্ঘদিন ধরেই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শিক্ষা বোর্ডের হিসাব ও নিরীক্ষা শাখার উপ-পরিচালক (ডিডি) ইব্রাহিম হোসেন বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবগত নই। বর্তমানে কন্ট্রোলার স্যারের অফিসে জরুরি মিটিং চলছে। এখানে চেয়ারম্যান স্যারও উপস্থিত আছেন।”
শিক্ষা বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, ভাইরাল ভিডিওতে অভিযুক্ত ব্যক্তি রেজাউল এই ডিডির দপ্তরে কর্মরত। তিনি দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করেন এবং কোনো স্থায়ী কর্মচারী নন। তবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার পিয়ন হওয়ার কারণেই তিনি সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার সাহস পান বলে দাবি করেন তারা।
তাদের মতে, দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে নিয়োজিত এ ধরনের অসাধু কর্মচারীদের কারণেই শিক্ষা বোর্ডের সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কাগজপত্র ও নথি এক টেবিল থেকে অন্য টেবিলে এসব কর্মচারীর হাত দিয়েই আদান-প্রদান হওয়ায় বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে।
ঘুষের ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলেও এ ঘটনায় এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থার ঘোষণা আসেনি। তবে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষের জরুরি বৈঠককে ঘিরে তদন্তের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





