নিজস্ব প্রতিবেদক: বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা এবং এ যাবতকালের সবচেয়ে কম ভোটার উপস্থিতির মধ্যে দিয়ে রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।
গতকাল রোববার (৭ জানুয়ারি) সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরুর পর থেকে বেলা সাড়ে ১২টা পর্যন্ত কেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি একেবারেই কম লক্ষ করা গেছে। বেলা বাড়ার পর বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি কিছুটা বাড়লেও তা সন্তোষজনক ছিল না। এটি কম ভোটার উপস্থিতির ক্ষেত্রে নজিরবিহীন এবং রেকর্ড হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এদিকে রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনে গড়ে ৪১ দশমিক ৬৮ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ জানিয়েছেন। রোববার বিকেলে ভোটগ্রহণ শেষে গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানান তিনি।
রিটার্নিং কর্মকর্তা বলেন, রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনেই দুয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ব্যতীত বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। অত্যন্ত সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবেই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এজন্য প্রার্থী-ভোটার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সবাইকে ধন্যবাদ জানাই।
এরআগে বেলা ১২টা পর্যন্ত ২২ শতাংশ ভোট কাস্ট হয় বলে রাজশাহী জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার মিডিয়া সেল থেকে জানানো হয়েছিল।
সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত রাজশাহীর ছয়টি সংসদীয় আসনের ৭৭০টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ছিল ৩১০টি। এখানে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিয়ে মোট ৪২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেন।
এদিকে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্যানেল মেয়র-১ নগরীর ২১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নিযাম-উল-আযীমকে আটক করেছে যৌথবাহিনী। ভোটারের টিসিবি কার্ড জব্দের অভিযোগে শনিবার (৬ জানুয়ারি) গভীর রাতে নগরীর সাগরপাড়া এলাকার নিজ বাড়ি থেকে তাকে আটক করা হয়। বর্তমানে তিনি র্যাবের হেফাজতে রয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাকে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির কাছে দেওয়ার কথা রয়েছে। তার বিরুদ্ধে ভোটারদের টিসিবির কার্ড নিয়ে রেখে পছন্দের প্রার্থীর জন্য ভোট নেওয়ার চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। কাউন্সিলর নিযাম-উল-আজিম রাজশাহী-২ (সদর) আসনের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ও মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অধ্যক্ষ শফিকুর রহমান বাদশার (কাঁচি) পক্ষে কাজ করছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভোটগ্রহণ চলাকালে রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের এমপি স্বতন্ত্র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক অভিযোগ করেন, বাগমারার তাহেরপুরের জামগ্রাম শ্রীপুরের রামগুয়া, চাইপাড়া, গণিপুরের বুজরোকোলা, জামালপুর, গোয়ালকান্দির কোনাবাড়িয়া, যোগীপাড়া ইউনিয়নের ডুগলপাড়াসহ বিভিন্ন ভোটকেন্দ্র থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দিয়েছে নৌকা প্রতীকের লোকজন। কোনো কোনো কেন্দ্রে এজেন্টদের ভোটকক্ষে ঢুকতেই দেয়া হয়নি। ভবানীগঞ্জ পৌরসভার সাদোপাড়া কেন্দ্রে পৌর মেয়র মালেককে মারধরসহ পিস্তল ও লাঠিসোঁটা নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের ভয় দেখিয়েছে তারা। এসব কেন্দ্রে ভোটদানে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলে নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি নৌকার প্রার্থীকে গ্রেফতারের দাবি জানান কাঁচি প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী এনামুল হক।
তবে রাজশাহী জেলা রিটর্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক শামীম আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার খবর পাওয়া গেলেও তা খুবই সামান্য। মাঠ পর্যায়ে জুডিশিয়াল এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা কাজ করছেন। কেউ নাশকতা বা ভোটগ্রহণ বাধাগ্রস্ত করতে চাইলে কঠোর হাতে তাকে দমন করা হবে।
দুই ঘণ্টায় ২০ ভোট : রাজশাহী-২ (সদর) আসনের একটি কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ শুরুর প্রথম দুই ঘণ্টায় ভোট পড়েছে মাত্র ২০টি, যা মোট ভোটারের মাত্র ১ দশমিক ০৯ শতাংশ। কেন্দ্রটির হলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল। রোববার সকাল ১০টার দিকে কেন্দ্রটির দায়িত্বরত প্রিজাইডিং অফিসার মো. আনোয়ার হোসেন গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন ।
প্রিজাইডিং অফিসার জানান, কেন্দ্রটির মোট ভোটার ১ হাজার ৮২২ জন। এরমধ্যে নারী ভোটার ৯৪৩ ও পুরুষ ভোটার ৮৮৩ জন। কেন্দ্রটিতে নৌকা ও কাঁচি প্রতীকের পোলিং এজেন্ট থাকলেও অন্যান্য প্রতীকের কোনো এজেন্ট নেই।
সকাল ৮টা থেকে পৌনে ৯টা পর্যন্ত সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ভোট শুরুর প্রথম আধা ঘণ্টায় শুধু একজন নারী কেন্দ্রে প্রবেশ করেছেন। পরে আরো দুজন পুরুষ ভোটার কেন্দ্রে প্রবেশ করলেও সিরিয়াল নম্বরের জটিলতায় তারা ভোট দিতে পারেননি। তবে কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার জানান, তাদের পূর্বেই কেন্দ্রের পাঁচটি বুথের দুই প্রার্থীর (নৌকা ও কাঁচি) দুজন করে মোট ১০ জন পোলিং এজেন্ট ভোট প্রদান করেন।
প্রিজাইডিং অফিসার আরো বলেন, ভোট শুরুর দুই ঘণ্টায় মাত্র ২০টি ভোট কাস্ট হয়েছে। এর মধ্যে দুই প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট ১০ জন, যা আমাদের কেন্দ্রের মোট ভোটারের ১.০৯ শতাংশ। তবে আমরা আশা করছি বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতিও আরো বাড়বে। রাজশাহী-২ (সদর) আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৪৫ জন।
বাঘায় অন্যের ভোট দিতে গিয়ে যুবক আটক : বাঘা উপজেলা সংবাদদাতা জানিয়েছেন, বাঘায় অন্যের ভোট দিতে গিয়ে পুলিশের হাতে আটক হয়েছেন এক যুবক। ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা তাকে ধরে তুলে দেন পুলিশের হাতে। রোববার দুপুরে বাঘা উপজেলার খাগড়বাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে অন্যের ভোট দিতে গিয়ে আটক হন তিনি। আটক যুবকের নাম মো. মহিবুল (৩০)।
এ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা রাহেনুল হক অভিযোগ করেন, মহিবুল নৌকা প্রতীকে জাল ভোট দিতে গিয়েছিলেন। তিনি রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনের আওয়ামী লীগের প্রার্থী শাহরিয়ার আলমের সমর্থক।
খাগড়বাড়িয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার সাওদ উল হক গণমাধ্যমকে জানান, তিনি অভিযোগ পান যে একজনের ভোট অন্যজন দিয়ে যাচ্ছেন। এ ব্যাপারে সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারদের সতর্ক করা হয়। দুপুরে মহিবুল অন্যজনের ভোট দিতে এলে তাকে আটক করা হয়। এরপর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া হয়।
অন্যদিকে বাঘা উপজেলার আরিফপুর কেন্দ্রে নৌকার দুই কর্মীকে মারপিট করে আহত করা হয়েছে। আহত দুই কর্মীর নাম রেজাউল করিম (৩২) ও মিশন সরকার (৩০)। তারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রোববার সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। স্বতন্ত্র প্রার্থী কাঁচি প্রতীকের রাহেনুল হকের সমর্থকেরা এই মারপিটের ঘটনা ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ করেন নৌকার প্রার্থীর লোকজন।
দুর্গাপুরে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ : রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় রোববার দুপুরের দিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোটারদের ভয় ভীতিপ্রদর্শন ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠে। দুর্গাপুর পৌর এলাকার রৈপাড়া কেন্দ্রে স্বতন্ত্র প্রার্থীর ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দিয়ে কেন্দ্র থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠে নৌকা প্রতীকের নেতা–কর্মীদের বিরুদ্ধে। খবর পেয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সেখানে উপস্থিত হলে নৌকার সমর্থকেরা সেখান থেকে পালিয়ে যায়।
গোদাগাড়ীতে ভোটকেন্দ্র দখলের অভিযোগ : রাজশাহী-১ আসনের গোদাগাড়ী উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের নবগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রটি দখল করার অভিযোগ উঠে ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে। সকাল থেকে এ কেন্দ্রে ভোটারদের ঢুকতে দিচ্ছেন না বলে গণমাধ্যমের কাছে অভিযোগ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী আয়েশা আক্তার ডালিয়া। অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতার নাম পারভেজ বাবু। তিনি আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ওমর ফারুক চৌধুরীর অনুসারী বলে সূত্র জানিয়েছে।
এছাড়া বাসুদেবপুর ইউনিয়নের কাপাসিয়াপাড়া বিদ্যালয়টি দখল করে জোর করে নৌকা প্রতীকে ভোট দেওয়ানোর অভিযোগ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী ডালিয়া। তিনি বলেন, এই কেন্দ্র দুটি নৌকা প্রার্থীর লোকজন ঘিরে রেখেছে। নৌকা প্রতীক বাদে অন্য কারও পক্ষে ভোট দিতে দিচ্ছে না। ভোটারদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে নৌকা প্রার্থীর অনুসারীরা।
গোদাগাড়ী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবদুল মতিন গণমাধ্যমকে বলেন, অভিযোগ পেয়ে ওই কেন্দ্রে পুলিশ গিয়েছিল। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালিয়ে গেছে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এছাড়া কাপাসিয়াপাড়ায়ও ফোর্স পাঠানো হয়েছে। সেখানে অভিযুক্তদের আটক করার জন্য বলা হয়।
ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে রাজশাহীজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রেই ১২ জন করে আনসার সদস্য ছিলেন। আর সাধারণ ভোটকেন্দ্রে তিনজন ও গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রে চারজন করে পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি পুলিশের মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, কুইক রেসপন্স টিম এবং বোম ডিসপোজাল ইউনিট মাঠে ছিল। এছাড়া রাজশাহীর প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় ছিল র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর টহল। তাদের সহায়তায় ভোটের মাঠে ছিলেন ৪৪ জন জুডিশিয়াল ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
সনি বাংলা ডট কম/ই আবি





