• রাজশাহী, বাংলাদেশ
  • ১১ই ডিসেম্বর, ২০২৫ খ্রিস্টাব্দ
  • নিবন্ধন এর জন্য আবেদনকৃত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  • news@sonybangla.news
  • ০১৭৭৫-৫৮৯৫৫৮

টানা পাচ বছর অফিস না করেও রুয়েট থেকে তুলছেন বেতন-ভাতা, কে এই টিটু

প্রকাশ: রবিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ২:০৬

টানা পাচ বছর অফিস না করেও রুয়েট থেকে তুলছেন বেতন-ভাতা, কে এই টিটু

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) পুরকৌশল বিভাগে জুনিয়র সেকশন অফিসার মো: আব্দুল ওয়াহেদ খান (টিটু) বছরের পর বছর অফিস না করেও বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিষয়টি নিয়ে রুয়েট ক্যাম্পাসে নানা সমালোচনা থাকলেও কেউই ভয়ে মুখ খুলতে পারেন না। ২০১৭ সালের ২৪ জুলাই রুয়েটে যোগদানের পর বছর খানেক গাঁছাড়া দিয়ে অফিস করেন। এরপর ২০১৮ সাল থেকে রুয়েটে একেবারেই অনুপস্থিত তিনি। টানা পাঁচ বছর অফিসে অনুপস্থিত থেকেও নিয়মিত তুলছেন বেতন-ভাতা; পেয়েছেন ইনক্রিমেন্ট। টিটুর এ ধরনের স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়টি রুয়েট কর্তৃপক্ষের নজরে থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময়েও নেয়া হয়নি কোনো আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা।

এদিকে আব্দুল ওয়াহেদ খান টিটু বর্তমানে রাজশাহী মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন বলে নিজেই স্বীকার করেছেন।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী ও নথি ঘেঁটে জানা গেছে, টিটু যোগদানের পর রুয়েটে অবস্থিত রূপালি ব্যাংক করপোরেট শাখায় ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই ৩৭২৩০১০০১৩৪৪০ নম্বরের একটি সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর খোলেন। ওই হিসাব নম্বরে আগস্ট ২০১৭ সাল থেকে আগস্ট ২০২৩ সাল পর্যন্ত নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রেরণ করেছে রুয়েট কর্তৃপক্ষ।
সর্বশেষ চলতি ২০২৩ সালের আগস্টে ওই হিসাব নম্বরে ৩০ হাজার ৫৩ টাকা ৫০ পয়সা বেতন জমা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, আব্দুল ওয়াহেদ খান টিটু রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মেয়রের এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিধি মোতাবেক সরকারি, বেসরকারি বা স্বায়ত্বশাসিত কোনো প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মকর্তাকে অন্য কোথাও দায়িত্ব পালন করতে হলে ডেপুটেশনে বা প্রেষণে অনুমতি সাপেক্ষে যেতে হয়। সেক্ষেত্রে তিনি বেতন-ভাতাদি কোন প্রতিষ্ঠান থেকে উত্তোলন করবেন তাও আইনে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু আব্দুল ওয়াহেদ খান টিটুর ক্ষেত্রে এ নিয়ম মানা হচ্ছে না। তিনি কাগজে কলমে রুয়েটের কর্মকর্তা হলেও বাস্তবে অনুপস্থিত; আবার বেতন-ভাতাও তুলছেন রুয়েট থেকে। তবে রুয়েটে তার অনুপস্থিতকালীন মেয়রের এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের কাছে টিটুর বিষয়ে কোনো ধরনের তথ্য নেই। এমনকি এপিএস-দের বেতন তালিকাতেও নেই তার নাম।
আব্দুল ওয়াহেদ খান টিটুর দাবি, ‘রুয়েটের ৮৪ তম সিন্ডিকেট সভার রেজুলেশনে আমার ডেপুটেশনে আসার অনুমতির বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। তবে অনুমোদনের কপি এখন আমার কাছে নেই, রাতে দেবেন বলে জানান তিনি। এরপর অনুমোদনের কপির জন্য রাতে আবার তাকে কল দেয়া হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। ফলে তার ডেপুটেশনে যাওয়ার অনুমোদনের কপি আদৌ আছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবিএম শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘আমার সিটি করপোরেশনে তিন বছর হলো দায়িত্ব পালন। এই সময়ে আব্দুল ওয়াহেদ খান টিটু নামে কেউ মেয়রের এপিএস ছিলেন কিনা সে সম্পর্কে অফিসিয়ালি কোনো তথ্য নেই। এই নামে কেউ ডেপুটেশনে বা প্রেষণে কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে আসলে সেই প্রতিষ্ঠান থেকে চিঠি দিতে হবে সিটি করপোরেশনকে এবং তিনি এক জায়গা থেকে বেতন-ভাতা উত্তোলন করতে পারবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, টিটুর ডেপুটেশনে বা প্রেষণে মেয়রের এপিএস হিসেবে দায়িত্ব পালন বিষয়ে কোনো অনুমোদনের চিঠি সিটি করপোরেশনের কাছে নেই। অর্থাৎ টিটু ডেপুটেশনে নেই।’

এদিকে এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন রাসিকের মেয়র হিসেবে পুনঃনির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু আগামী ১১ অক্টোবরের আগে মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবেন না তিনি। কারণ রাসিকের বর্তমান পরিষদের মেয়াদ এখনো শেষ হয়নি। মেয়র নির্বাচনের জন্য খায়রুজ্জামান লিটনকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল। কিন্তু কাউন্সিলরদের ক্ষেত্রে সে নিয়ম বলবৎ নেই।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০০৪ সালে আব্দুল ওয়াহেদ খান টিটু রাজশাহী কলেজ শাখা ছাত্রলীগের আহ্বায়ক ছিলেন। পরে ২০১৩ সালে মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের যুগ্ন-সাধারণ সম্পাদক পদে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।

রুয়েট সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, রাজশাহীর প্রভাবশালী এক নেতার ডিও ও জোর সুপারিশে রুয়েটে চাকরি হয় টিটুর। রাজনৈতিকভাবে ব্যাপক প্রভাব ও পরিচিতি থাকার কারণে চাকরি পাবার পরও ঠিকমতো অফিসে আসতেন না তিনি। তার প্রভাব-প্রতিপত্তির ভয়ে রুয়েটের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও মুখ খুলতেন না। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ২০১৮ সালে রাজনৈতিক তদবিরে কোনো প্রকার অফিস আদেশ ছাড়াই (ডেপুটেশন/ছুটি) রুয়েট ছেড়ে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়রের এপিএস হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর থেকেই রুয়েটে অনুপস্থিত টিটু।

তবে ২০১৮ সালে অফিসে অনিয়মিত থাকায় তৎকালীন রুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো: নিয়ামুল বারী তাকে এসিআর দেননি। এ নিয়ে বেগ পেতে হয় বিভাগীয় প্রধান নিয়ামুল বারীকেও। রাজনৈতিক ক্ষমতা ও তৎকালীন রুয়েট কর্তৃপক্ষের অনৈতিক চাপের মুখে মাত্র ছ’মাসের মাথায় ছাড়তে হয় বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব। বর্তমানে তিনি প্রকৌশল বিভাগে ডীনের দায়িত্বে রয়েছেন। এরপর দায়িত্ব নেন অধ্যাপক ড. মো: কামরুজ্জামান-১ (রিপন)। টিটু অফিসে অনুপস্থিত থাকার পরও বিভাগীয় প্রধান কামরুজ্জামান রিপন তাকে ২০১৯ সালে এসিআর প্রদান করেন। ২০২০ সালে একই কান্ডের অংশীদার হন পরের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. কামরুজ্জামান-২ (নয়ন)। তবে ২০২২ সালে অধ্যাপক ড. মো: মাহমুদ সাজ্জাদ বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্বে নিযুক্ত হলে টিটুর অনুপস্থিতির কারণে তাকে আর কোনো এসিআর প্রদান করেননি।
আব্দুল ওয়াহেদ টিটু কোথায় আছে? জানতে চাইলে পুরকৌশল বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মো: মাহমুদ সাজ্জাদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘তিনি কোথায় বা তার অবস্থান কি; আসলে আমি এটা সঠিক জানি না। আমি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তাকে দেখিনি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আছেন নাকি অন্য কোনো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাইরে আছেন এই বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভালো জানেন।’

বিভাগীয় প্রধান হিসেবে তার খোঁজ নেয়ার কখনো কি চেষ্টা করেছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘চেষ্টা করিনি। তবে আমি ভেবেছি তিনি বা অন্যরা যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে আছেন, অফিসের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই বাইরে আছেন। তাই খোঁজ নেইনি। তবে যেহেতু আমি জানতাম না তিনি কোন ডেপুটেশন বা অনুমতি ছাড়াই দফতরে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত আছেন; সেহেতু আমি এ ব্যাপারে রেজিস্টারের কাছে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার নেয়ার জন্য একটি চিঠি ইস্যু করবো।’ তবে অফিসে তাকে না দেখায় তিনি কোনো এসিআর দেননি বলেও জানান পুরকৌশল বিভাগীয় প্রধান মাহমুদ সাজ্জাদ।
টিটুকে এসিআর দেবার ব্যাপারে তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো: কামরুজ্জামান-১ (রিপন) গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি টিটুকে একমাসের মতো পেয়েছিলাম। তারপর একটা কমিটির মাধ্যমে তাকে ডেপুটেশন দেবার জন্য সংস্থাপন দফতরে একটি চিঠি প্রদান করা হয়। কিন্তু ফিরতি চিঠি আমি পাইনি আর ওইভাবে খোঁজও নেইনি। পরে এসিআরের জন্য টিটু আবেদন করলে তাকে সেটি প্রদান করি।’

অন্যদিকে, টিটুর ব্যাপারে জানতে পুরকৌশল বিভাগের পরবর্তী সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো: কামরুজ্জামান-২ (নয়ন) এর মোবাইলফোনে একাধিকবার কল করেও না পাওয়ায় তার মন্তব্য জানা যায়নি।

বাংলাদেশ গেজেটের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সরকারি বিধি-২০১৯ মোতাবেক, ‘চাকরি স্থায়ী না হলে কোনো কর্মচারীকে প্রেষণে নিয়োগ দেয়া হবে না’।

পাঁচ বছর ধরে অনুপস্থিত থেকেও বেতন-ভাতা পাওয়ার বিষয়ে কম্পট্রোলার নাজিমউদ্দীন আহম্মদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি যদি জানতাম প্রথমেই তার বেতন বন্ধ করে দিতাম। কিন্তু আমার এসব জানা নেই। এগুলো সংশ্লিষ্ট বিভাগ বা রেজিস্ট্রার দফতর থেকে জানাবে তারপর আমি পদক্ষেপ নিতে পারব।’

তিনি বলেন, ‘একজন ব্যক্তি কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি জায়গায় যেতে চাইলে তাকে অবশ্যই ডেপুটেশন নিয়ে যেতে হবে। সেক্ষেত্রে তিনি এক জায়গা থেকে বেতন-ভাতা পাবেন। আর এটা যদি না করেই তার দফতরে অনুপস্থিত থাকে তবে তার বেতন বন্ধ হয়ে যাবে।’
দীর্ঘ পাঁচ বছর অনুপস্থিত থাকার ঘটনায় তার কাছ থেকে বেতন ফেরত নেয়া হবে কি-না তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা ভিসি এবং রেজিস্টার দফতর সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এ ব্যাপারে আমি জানি না।’

এদিকে সদ্য ভারপ্রাপ্ত রেজিস্টারের দায়িত্ব নিয়েছেন আরিফ আহমেদ চৌধুরী। গণমাধ্যমের কাছে তিনি স্বীকার করেন পুরকৌশল বিভাগের জুনিয়র সেকশন অফিসার আব্দুল ওয়াহেদ টিটু কোনো প্রকার ডেপুটেশন নেয়ার আবেদন করেননি। এমন কোনো পত্র তার ফাইলে নেই।

তিনি বলেন, ‘যে কোনো দফতর বা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী বিদেশে যাক কিংবা ছুটিতে যাক বা অন্য কোনো কাজে যাক না কেন; তারা তাদের নিজের ডিপার্টমেন্টের কাছ থেকে আমাদের রেজিস্টার দফতরে চিঠি পাঠাবে। তার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা অর্ডার করি এবং সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্ট বা দফতর প্রধানের কাছে পাঠাই।’
তিনি আরো বলেন, ‘যেহেতু আমি সদ্য দায়িত্ব নিয়েছি তাই আমার চেয়ে ভালো বলতে পারবেন পূর্বের রেজিস্টার প্রফেসর ড. মো: সেলিম হোসেন।’

জানতে চাইলে তৎকালীন রেজিস্টার সেলিম হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার সময়ে আব্দুল ওয়াহেদ টিটুর কোনো ডেপুটেশনের আবেদন পাইনি। যেহেতু এই বিষয়টি এতদিন পর জানা গেছে সেহেতু এই ফাইলটি বিভাগীয় প্রধানের কাছে পাঠানো হবে এবং তার (বিভাগীয় প্রধানের) কাছে জানতে চাওয়া হবে ওই কর্মকর্তা কোথায়। তখন তিনি ওই ফাইলে একটি চিঠিতে লিখে দিবেন। তখন আমরা আইন অনুসারে এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

পাঁচ বছর আগে আইন কাজ করলো না, এখন আইন কাজ করছে কেন? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আসলে তিনি খাতা-কলমে আছেন, বাস্তবে নেই। আর ডিপার্টমেন্ট থেকেও আমরা এ বিষয়ে কোনো আপত্তি পাইনি, তাই।

জানতে চাইলে রুয়েটের ভিসি অধ্যাপক ড. মো: জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘আমি তো এসেছি মাত্র কিছুদিন হলো। আজকে ১৫তম দিন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিভাগে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।

তবে এক প্রশ্নের জবাবে ভিসি বলেন, কর্মস্থলে তার (টিটু) অনুপস্থিতির বিষয়টি প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
সনি বাংলা ডট কম/ই আবি

সর্বশেষ সংবাদ

 

রাজনীতি-এর আরও সংবাদ

 



প্রকাশক ও সম্পাদক: মো: ইফতেখার আলম বিশাল

যোগাযোগ: শিরোইল গৌধুলী মার্কেট ঢাকা বাস টার্মিনাল বোয়ালিয়া রাজশাহী। ই-মেইল: smbishal18@gmail.com, মোবাইল:০১৭৭৫-৫৮৯৫৫৮