রাজশাহী প্রতিনিধি: বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) কুড়িগ্রাম রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোঃ এজাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম, দায়িত্ব পালনে অবহেলা, শৃঙ্খলা ভঙ্গ, দাপ্তরিক আদেশ অমান্য, অসদাচরণ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বিভাগীয় মামলা (নং ০৩/২০২৫) রুজু করেছে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়।
চার্জশিটে দীর্ঘ কর্মজীবনে তার বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগ ও অসদাচরণের প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন দপ্তরে কর্মরত অবস্থায় একাধিকবার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করে দপ্তরীয় কার্যক্রম ব্যাহত করেন তিনি। এমনকি বদলির আদেশ পাওয়ার পরেও দায়িত্ব যথাসময়ে হস্তান্তর না করে দপ্তরের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করেন।
দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও স্বেচ্ছাচারিতা চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, ড. এজাদুল ইসলাম কুড়িগ্রাম রিজিয়নে বদলি হওয়ার পরও দায়িত্ব হস্তান্তরের পূর্বশর্ত হিসেবে নিজের পছন্দমতো রিলিভার ছাড়া অন্য কাউকে দায়িত্ব দিতে অস্বীকৃতি জানান, যা কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য এবং স্বেচ্ছাচারিতার শামিল। এমনকি নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীকে জানানো সত্ত্বেও ই-টেন্ডার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াকরণে বিলম্ব করেন, যা রিজিয়নের উন্নয়ন কার্যক্রমে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।
পূর্বেও একাধিকবার অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে কর্মরত অবস্থায় তার বিরুদ্ধে অফিসের অধঃস্তন কর্মচারীকে মারধর, গালিগালাজ, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি, জোন বদলির পর দায়িত্ব না হস্তান্তর করেই ছাড়পত্র প্রদান, সেচচার্জে অনিয়মসহ অর্থনৈতিক নীতিমালা ভঙ্গের মতো অভিযোগে অন্তত সাত-আটবার কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে।
বিশেষ করে ফুলবাড়ী, হরিপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ এবং গাইবান্ধা অঞ্চলে তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের প্রমাণপত্র সংরক্ষিত রয়েছে। চরম অসদাচরণ ও কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ একাধিক ঘটনায় অধীনস্থ চালক ও সহকারীদের সঙ্গে দপ্তরের বাইরে এবং জনসম্মুখে শারীরিক ও মানসিক লাঞ্ছনার অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় বিএমডিএর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়।
দুর্নীতি ও ঘুষের অভিযোগে ৪২ ঠিকাদারের আবেদন ড. এজাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, দুর্নীতি ও খারাপ আচরণের অভিযোগ এনে ২০১৯ সালে গাইবান্ধা রিজিয়নে কর্মরত অবস্থায় ৪২ জন ঠিকাদার যৌথভাবে কৃষি মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগ তদন্তের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় বিএমডিএকে নির্দেশনা দেয়।
চাকুরিচ্যুতির সম্ভাবনা চার্জশিটের শেষে বলা হয়, এজাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮ এর ৪(১)(খ) ধারা অনুযায়ী বরখাস্তসহ যথোপযুক্ত শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে। তাকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়ে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়া হয়েছে।
বিএমডিএর মতো একটি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন সংস্থায় একজন পদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এত সংখ্যক গুরুতর অভিযোগ প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয় বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান অনিয়মের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেয়ার কারণেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলেও মনে করছেন অনেকেই। এ ঘটনায় বিএমডিএর অভ্যন্তরীণ নজরদারির দুর্বলতা এবং সুশাসনের অভাবের বিষয়টিও সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে জানতে কুড়িগ্রাম রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. মোঃ এজাদুল ইসলাম বলেন, “বিএমডিএর প্রাক্তন চেয়ারম্যান আসাদ স্যার মারা যাওয়ার পর থেকেই আমার বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে আমার বিরুদ্ধে বিভাগীয় চিঠি ইস্যু করানো হয়েছে। যেসব অভিযোগ বর্তমানে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই পুরাতন এবং ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মীমাংসিত হয়েছে। তবুও এসব বিষয় আবার নতুন করে সামনে এনে ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক।”
এ বিষয়ে বিএমডিএ’র সচিব এনামুল কাদেরকে ফোন ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাজশাহী জেলার সভাপতি আহমদ শফি উদ্দিন বলেন, সরকারি দপ্তরে শৃঙ্খলা ও পেশাগত আচরণ রক্ষায় দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানিক ন্যায়ের জায়গাটি ক্রমাগত প্রশ্নবিদ্ধ হবে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় দুর্নীতির দ্বার খুলে দিতে পারে।





