রাজশাহী প্রতিনিধি: দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) সহকারী প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রী নিশাত তামান্নার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা দুই মামলা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক অ্যাখ্যা দিয়ে প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। মামলা দুটি বর্তমানে রাজশাহীর বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতে চলমান রয়েছে। অন্যদিকে রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের সুপারিশ আইন মন্ত্রণালয়ে বাছাই কমিটিতে আছে। যদিও দুর্নীতি দমন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। তাদের সঙ্গে কেউ আলোচনাও করেননি। রাজশাহীর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. রইসুল ইসলাম মামলা দুটি প্রত্যাহারের সুপারিশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। যুগান্তর
দুর্নীতি দমন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুর্নীতির মাধ্যমে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০২২ সালের ১ জুন রাজশাহী দুদকের সহকারী পরিচালক আমির হোসাইন রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সহকারী প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতির মামলা করেন। একদিন পর ২ জুন শেখ কামরুজ্জামানের স্ত্রী নিশাত তামান্নার বিরুদ্ধে আরও একটি মামলা করেন দুদক। তদন্ত শেষে একই বছরের ৩০ আগস্ট শেখ কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ১ কোটি ৬ লাখ ৬৯ হাজার ৯১১ টাকার সম্পদ অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়। একই দিনে শেখ কামরুজ্জামানের স্ত্রী নিশাত তামান্নার বিরুদ্ধে ৬৮ লাখ ৪৯ হাজার ৭৮৪ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অবৈধভাবে অর্জনের অভিযোগপত্র দাখিল করেন দুদকের সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে বলা হয়, শেখ কামরুজ্জামান দুর্নীতির মাধ্যমে নিজে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন এবং তার স্ত্রীও একইভাবে অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন যা দুর্নীতিবিরোধী আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ।
সূত্রমতে, দুর্নীতির মামলায় অভিযোগ দাখিলের পর ২০২৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর শেখ কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রী নিশাত তামান্না জামিনের আবেদন করলে রাজশাহী মহানগর স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক তাদের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। ফলে আরডিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান সহকারী প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামানকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। বেশ কয়েক মাস কারাগারে থেকে উচ্চ আদালতের আদেশে জামিন পান কামরুজ্জামান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের একটি গ্রুপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তাদের দিয়ে কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করেন কামরুজ্জামান। ফলে আরডিএ কর্তৃপক্ষ শেখ কামরুজ্জামানের দুর্নীতির মামলা আদালতে চলমান থাকার পরও সাময়িক বরখাস্তের আদেশ তুলে নিতে বাধ্য হন।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজনৈতিক বিবেচনায় করা হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করলে শেখ কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রী রাজশাহীর জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর দুর্নীতির দুই মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেন। কামরুজ্জামান নিজেকে জাতীয়তাবাদী প্রকৌশলী ও পেশাজীবীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশান অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (অ্যাব) একজন নিবেদিতপ্রাণ নেতা দাবি করেন আবেদনে। অন্যদিকে কামরুজ্জামানের স্ত্রী নিশাত তামান্না নিজেকে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের নেত্রী দাবি করে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সুপারিশ নিয়ে তার বিরুদ্ধে থাকা দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেন। আবেদনে স্বামী-স্ত্রী আরও দাবি করেন তারা সাবেক সরকারের আমলে হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তারা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে তাদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অবৈধভাবে সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতি মামলা করা হয়েছে। নিশাত তামান্না দাবি করেন তার বাবা বিএনপির একজন নেতা এবং তিনি নিজেও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
জেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাই শেষে গত মার্চে জেলা কমিটির সভাপতি ও রাজশাহীর সাবেক জেলা প্রশাসক আফিয়া আকতার, শেখ কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রী নিশাত তামান্নার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির দুই মামলা প্রত্যাহারে আইন মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠান। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার সংক্রান্ত কমিটির সভাপতি। এ কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম), পুলিশ সুপার ও পাবলিক প্রসিকিউটর। এ বিষয়ে জানতে রাজশাহীর সাবেক জেলা প্রশাসক আফিয়া আকতারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি এখন মনে করতে পারছেন না বলে জানান। রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উম্মে কুলসুম সম্পা জানান, তিনি বিদেশে আছেন। জেলা প্রশাসনের জুডিশিয়াল শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সামিয়া রহমান জানান, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। বিস্তারিত জানাতে হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগবে।
একজন সরকারি কর্মকর্তা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে করা দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের দুই মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের রাজশাহী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) ফজলুল বারী জানান, শেখ কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির দুটি ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে একটি মামলা আদালতে চলমান আছে। তবে দুটি মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে কোনো কর্তৃপক্ষ বা কেউ দুদককে অবহিত করেননি অথবা মতামতও জানতে চায়নি।
রাজশাহীর পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. রইসুল ইসলাম জানান, প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামান ও তার স্ত্রী নিশাত তামান্নার বিরুদ্ধে করা দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলাগুলো রাজনৈতিক হয়রানিমূলক। আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে সত্যতা পাওয়ায় জেলা কমিটি মামলা দুটি প্রত্যাহারের সুপারিশ পাঠিয়েছে মন্ত্রণালয়ে। পিপি আরও দাবি করেন শেখ কামরুজ্জামান জাতীয়তাবাদী প্রকৌশলীদের সংগঠন অ্যাবের নেতা এবং তার স্ত্রী নিশাত তামান্না জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের নেত্রী। সবকিছু যাচাই-বাছাই করে তাদের মামলাগুলো প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে কামরুজ্জামান অ্যাবের কোন পদে আছেন ও তার স্ত্রী মহিলা দলের কোন পদে আছেন সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাতে পারেননি। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ এলে মামলাগুলো আদালত থেকে প্রত্যাহার হয়ে যাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকৌশলী শেখ কামরুজ্জামানের বাড়ি কুষ্টিয়া জেলার বারখাদা গ্রামে। স্ত্রী নিশাত তামান্না রাজশাহী মহানগরীর শাহ মখদুম থানার পবা নতুনপাড়ার নূরুল ইসলামের মেয়ে। নুরুল ইসলাম ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য। আরডিএর একটি সূত্র জানায়, শেখ কামরুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে চাকরি নেওয়াসংক্রান্ত দুদকের করা আরও একটি পৃথক মামলা আদালতে চলমান আছে।





