নিজস্ব প্রতিবেদকঃ আগামী ৩ ডিসেম্বর রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে গণসমাবেশ করবে
বিএনপি। অনুষ্ঠিতব্য এ গণসমাবেশে নেতাকর্মীদের ব্যাপক সমাগম ঠেকাতে
বৃহস্পতিবার থেকে রাজশাহী বিভাগে অনির্দিষ্টকালের জন্য পরিবহন ধর্মঘট
ডাকা হয়েছে বলে বিএনপি নেতারা অভিযোগ করেছেন। তাই বুধবার থেকেই বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে নেতাকর্মীরা রাজশাহীতে আসতে শুরু করেছেন।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু
জানিয়েছেন, বুধবার রাত পর্যন্ত অন্তত দুই লাখ নেতাকর্মী বিভাগের বিভিন্ন
জেলা ও উপজেলা থেকে রাজশাহী এসে পৌঁছান। এ সংখ্যা বাড়ছেই। তারা
রাজশাহীতে আবাসিক হোটেল ও কমিউনিটি সেন্টারে থাকার সুযোগ না
পেয়ে খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করছেন। এছাড়া যারা যেভাবে পারছেন নিজেদের মত করে অবস্থান নিয়ে থাকছেন।
আটটি শর্তে রাজশাহীতে বিএনপিকে গণসমাবেশের অনুমতি দিয়েছে পুলিশ।
প্রতিটি বিভাগীয় গণসমাবেশের আগেই ডাকা হচ্ছে গণপরিবহন ধর্মঘট।
তাই আগে থেকেই নেতাকর্মীরা আসছেন রাজশাহীতে। নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে ও সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পথে পথে পুলিশি বাধার কারণে অন্তত ১০ থেকে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত পায়ে হেঁটে নেতাকর্মীরা রাজশাহী আসছেন। একে তো পরিবহন ধর্মঘট, তার ওপর নিজস্ব ও ভাড়া করা পরিবহনে বুধবার
রাতে ও বৃহস্পতিবার রাজশাহী আসার পথে পুলিশি বাধার কারণে দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে রাজশাহী পৌছান নেতাকর্মীরা। এতে তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েন।
বেগম বদরুন্নেসা কলেজ ছাত্রদলের সাবেক ভিপি ও পাবনার সাথিঁয়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি খায়রুন নাহার খানম মিরু বলেন, বুধবার রাতে আমার নিজ এলাকা থেকে বাসে করে ছয় শতাধিক নেতাকর্মী নিয়ে রাজশাহী আসছিলাম। পথে কাটাখালী আসার আগেই পুলিশি বাধার মুখে পড়তে হয়। শেষ পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে রাজশাহী পৌছি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাজশাহী পৌঁছার পর রাত ১১টার দিকে গণসমাবেশস্থল মাদ্রাসা মাঠ সংলগ্ন ফাঁকা জায়গায় নেতাকর্মীদের খাবারের জন্য চুলায় রান্না করা হচ্ছিল। এসময় সিভিল পোশাকে একদল পুলিশ এসে চুলায় পানি ঢেলে ভিজিয়ে দেয়।
রাত আড়াইটা পর্যন্ত পুলিশ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এতে করে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় আমাদের। তিনি আরো বলেন, চুলায় কেন পানি ঢেলে দেওয়া হল আমি তা পুলিশকে জিজ্ঞাসা করি। তখন পুলিশ পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, আপনারা কেন এখানে এসেছেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নগরীর রাজপাড়া থানার ওসি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।
রাজশাহীতে গণসমাবেশের উদ্দেশে বুধবার রাতে বগুড়া থেকে বাসে রওনা
দিয়েছিলেন অন্তত ৫০০ নেতাকর্মী। কিন্তু পথেই তারা রাজশাহীর মোহনু
উপজেলার কামারপাড়া এলাকায় পুলিশি বাধার মুখ পড়েন। এ ব্যাপারে বগুড়া শহর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম মর্শেদুল মিঠন গণমাধ্যমকে বলেন, তারা
শান্তিপূর্ণভাবে বগুড়া থেকে রাজশাহী আসছিলেন। পথে কামারপাড়া এলাকায় পৌঁছলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এসময় একটি গাড়ির কাঁচ ভাঙচুর করা হয়। এক নেতার মাথায় রক্তাক্ত জখম হন। এক পর্যায়ে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে ৩০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে সকাল সাড়ে ছয়টায় তারা রাজশাহী
নগরীতে এসে পৌঁছান।
একই ভাবে বিভাগের বিভিন্ন জেলা থেকে নেতাকর্মীরা রাজশাহী আসার পথে বিভিন্ন স্থানে পুলিশি বাধার সম্মুখীন হন। পরে তারা পায়ে হেটে রাজশাহী পৌছান। বিভিন্ন দূরবর্তী এলাকা থেকে বহু কষ্টে নেতাকর্মীরা রাজশাহী পৌঁছার পর পদ্মা নদীর ধারে ও নগরীর অন্যান্য ফাঁকা জায়গায় খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান।
মোহনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেলিম বাদশা গণমাধ্যমকে বলেন, বেশ কিছু গাড়ির কাগজপত্র ছিল না। এ ধরণের গাড়িতে করে লোকজন আসছিল। এসব গাড়ি গিয়ে নাশকতা ঘটানোর আশংকা রয়েছে। এ জন্য এসব গাড়ি তারা ফিরিয়ে দিয়েছেন। এছাড়া রাজশাহী মহানগর ও মোহনপুর থানার সীমানায় ব্যাপক
যানজট দেখা দিয়েছিল। তবে কেউ আহতও হননি বা ভাঙচুরের কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানান ওসি।
বৃহস্পতিবার সকালে মাদ্রাসা মাঠ সংলগ্ন শাহমখদুম ঈদগাহ মাঠে গিয়ে দেখা গেছে, বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীর কেউ খোলা আকাশের নিচে, কেউ গাছতলায় কিংবা কাপড়ের তাবু বানিয়ে মাঠে খড়ের ওপর জটলা করে শুয়ে রয়েছেন। তাদের শৌচকার্যের জন্য অদূরেই বাধের ওপারে নদীর বালুর ওপর তৈরি করা হয়েছে সীমিত
পরিসরে অস্থায়ী শৌচাগার।
রাতে আবু বক্কর নামের এক ব্যক্তি নওগাঁ থেকে রাজশাহী এসে পৌঁছান। পরনে কাফনের কাপড় পরা ওই ব্যক্তি বলেন, গণসমাবেশ স্থলে দাবি আদায় করেই তবে ঘরে ফিরবেন তিনি। তাই প্রস্তুত হয়েই এসেছেন।
এসময় বগুড়া জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদককে দেখা গেল ঘুরে ঘুরে খোলা আকাশের নিচে থাকা কর্মীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। তিনি জানান, আজকের মধ্যেই তাদের জেলা থেকে ট্রাকে করে শত শত মানুষ চলে আসবেন। পথে পথে পুলিশি
বাধা রয়েছে। তারপরও নেতাকর্মীরা ২০-৩০ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে চলে আসছেন।
দুপুরে দেখা গেল রাজশাহী মহানগর যুবদলের সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম রবি দূর থেকে আসা কর্মীদের তদারকি ও খোজখবর নিচ্ছেন। কোনো সমস্যা হলে সমাধানের চেষ্টা করছেন।

সিরাজগঞ্জ জেলার নুরুন্নবীকে দেখা গেল মুড়িভর্তি বড় পলিথিন হাতে নিয়ে
কর্মীদের ডেকে বেড়াচ্ছেন। অনেকেই তার কাছে এসে চিড়া ও মুড়ি খেয়ে
যাচ্ছেন। তিনি জানান, খাবার হিসেবে চিড়া, মুড়ি ও পানি মজুদ রয়েছে।
অনেকেই চাল, ডাল, সবজি, তেল একসঙ্গে বেঁধে নিয়ে এসেছেন। মাঠের
বিভিন্ন স্থানে শুয়ে থাকা জটলার পাশে অস্থায়ী চুলায় রান্না ওঠানো হয়েছে।
অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘটে ভোগান্তিতে মানুষ : বৃহস্পতিবার (১
ডিসেম্বর) সকাল ৬টা থেকে রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলায় পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়েছে। ফলে সড়ক পথে রাজশাহীর আট জেলার সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ গোটাদেশের পরিবহন যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। আর ধর্মঘটের প্রথম দিনেই অচল হয়ে পড়েছে রাজশাহী। ধর্মঘটের কারণে সব ধরনের বাস চলাচল বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন ঢাকাসহ বিভিন্ন রুটের যাত্রীরা।
যানবাহন না পেয়ে দূর-দূরান্তে নিজ নিজ গন্তব্যের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়েও পথে পথে যাত্রীরা নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সকাল থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার উদ্দেশে মহানগরীর শিরোইল, ভদ্রা ও রেলগেট বাস টার্মিনালে আসেন যাত্রীরা। কিন্তু বাস
না পেয়ে কেউ বিকল্প যানবাহন কেউবা বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। অনেককে আবার
রাজশাহী রেল স্টেশনে ভিড় করতে দেখা গেছে।
ধর্মঘটের ফলে চাপ পড়েছে ট্রেনে। তাই বিভিন্ন রুটের ট্রেনের টিকিট এরই
মধ্যে হাওয়া গেছে। টিকিট না পেয়ে অনেকে দাঁড়িয়েই রওয়ানা দিচ্ছেন।
এছাড়া পরিবহন ধর্মঘটের কারণে সকাল থেকেই ভোগান্তি পোহাচ্ছেন রাজশাহীর আন্তঃজেলা রুটের যাত্রীরাও। সিএনজি, হিউম্যান হলার, মাইক্রোবাসসহ বিভিন্ন বিকল্প যানবাহনে দ্বিগুণ ভাড়া দিয়ে যাত্রীরা জরুরি প্রয়োজনে নিজ গন্তব্যে
রওয়ানা দিচ্ছেন।
বিএনপির রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, মূলত পরিবহন শ্রমিক ও মালিকরা সরকারকে এই পরিবহন ধর্মঘটের মাধ্যমে সহযোগিতা করতে চাইছেন। বিএনপির প্রত্যেকটা সমাবেশের আগেই বিভিন্ন বিভাগ ও জেলায় এমন ধর্মঘট ডাকা হয়েছে। তবে এতকিছুর পরও মানুষ কোনো না কোনোভাবে গণসমাবেশে গেছেই এবং শতভাগ সফলও হয়েছে। তাই ধর্মঘট দেওয়া হোক, আর যা-ই দেওয়া হোক না কেন- রাজশাহীতে ৩ ডিসেম্বরের
গণসমাবেশে জনস্রোত নামবে। শুধু সমাবেশস্থল মাদ্রাসা মাঠ নয়, পুরো
রাজশাহী নগরী জনসমুদ্রে পরিণত হবে।

তবে বিএনপির এমন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে রাজশাহী বিভাগীয় পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিউল হক বলেন, বিএনপির গণসমাবেশ সামনে রেখে এমন সিদ্ধান্তের বিষয়টি সঠিক নয়। তাদের দাবির মধ্যেও এমন কিছু উল্লেখ নেই। তারা মহাসড়ক থেকে নছিমন, করিমন, ভটভটিসহ অবৈধ যানবাহন
চলাচল বন্ধসহ ১১ দফা দাবিতে আদায়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসছেন। বিভিন্ন সময় প্রশাসনকে এ বিষয়ে চিঠিপত্র দেওয়া হয়েছে। কিছুদিন আগেও তারা সংবাদ সম্মেলন করে এসব দাবির বিষয়ে কথা বলেছেন। দাবি আদায়ে ধারাবাহিক
কর্মসূচি পালন করে আসছেন। এই কর্মসূচি এবারই প্রথম নয়। গত ২৬ নভেম্বর নাটোরে বিভাগীয় পরিবহন নেতারা বসে আলোচনা করেই ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
সনি বাংলা ডট কম/ ই আবি





